খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
তারুণ্য—এই একটি শব্দেই লুকিয়ে আছে স্বপ্ন, শক্তি, সাহস ও সম্ভাবনার অনন্ত সম্ভার। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের তরুণদের চিন্তা, চেতনা ও দায়িত্ববোধের উপর। তাদের চিন্তা যত বিশুদ্ধ, পথচলা যত দৃঢ়—সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র ততটাই এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তরুণরাই দেখিয়ে দিয়েছে তারুণ্য মানেই স্বপ্ন দেখার সাহস এবং তা পূরণের অঙ্গীকার। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণদের মাঝে ব্যাপকভাবে মৌলবাদি ও উগ্র গোষ্ঠিগুলোর মধ্যে নিজেদেরকে সঁপে দেয়া, দীর্ঘ বিরতির পর দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের একচ্ছত্র বিজয় ও সর্বত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করা— শুধু উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে বড় রকমের প্রশ্নবোধক বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে!
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালির সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকে হামলা, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত অসংখ্য ভাস্কর্য ভাঙচুর, মঞ্চ নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার দুঃসাহস, দেশের লোকজ সংস্কৃতি কর্মী সহ বাউল-শিল্পীদের ওপর নগ্ন হামলা ও কারাগারে প্রেরণ, পীর-আউলিয়াদের দরগা ও মাজার ভাংচুর, সনাতনি ধর্ম সহ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা, দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উগ্রবাদের ভয়ংকর উত্থান— সব মিলিয়ে যৌক্তিক কারণেই নিজ মনে প্রশ্ন জাগে এরা কি আমাদের দেশের তরুণ, আমাদের জাতির ভবিষ্যত? এ কি চিরচেনা সেই প্রিয় বাংলাদেশ? যেখানে জাতির রক্ষাকবজ হিসেবে বারবার আমরা তারুণ্যের শক্তির উপরই নির্ভর করে এসেছি। এসব জঘন্য কার্যকলাপ প্রতিরোধে দেশের আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীসমূহকেও কেনো কোন কার্যকরী ভূমিকা পালনে দেখা যাচ্ছেনা?
বাংলাদেশি হিসেবে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র পরিচিতি বা অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ১৯৭১ সালের দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। শুধু বাংলাদেশি হিসেবে পরিচিতিই নয়, ১৬ ডিসেম্বর হলো আমাদের ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। এ বিজয় মোটেই সহজ ছিল না। এটি কারো দান নয়। এটি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হতে হতে দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রতিরোধের চূড়ান্ত ফলাফল। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচনসহ ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। বাংলাদেশের ইতিহাসের এই প্রতিটি ঘটনায় বড় শক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে দেশের তরুণ প্রজন্ম। ১৯৭১-এ তরুণরা অস্ত্র হাতে দেশের জন্য জীবন দিয়েছিল, ১৯৯০-এর গণআন্দোলনে সামরিক শাসনের পতন ঘটিয়েছিল, আর ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানেও তারা প্রমাণ করেছে— বাংলাদেশ মাথা নত করবে না। সেই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাস্তায় নেমে আসা লাখো তরুণের চোখে ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগুনের মতোই দীপ্তি। ‘বিজয়ের চেতনা’ বা ‘স্বাধীনতার মূল্য’— এসব শব্দ তখন আর ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল তাদের আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি।
দূর্ভাগ্যবশত, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালের সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের লুকায়িত চেহারা ক্রমান্বয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। নানা নামে নানা বেশে তারা সাধারণ বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে থাকলেও তাদের অধিকাংশের আসল রাজনৈতিক লেবাস একের পর এক বেরিয়ে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিজস্ব অর্জন নয়, এখানে দেশের সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করেছিল। অথচ আওয়ামী বিরোধিতার নামে বিগত ২০২৪ সনের ৫ আগস্ট থেকে এদের অনেকের প্রকৃত রাজনৈতিক দর্শন বেরিয়ে আসতে শুরু করে। দেশের প্রায় সর্বত্রই শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি সহ মব সৃষ্টি করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সকল স্মৃতিসমূহকে। সারাদেশে এখন হরহামেশাই ফ্যাসিবাদের ট্যাগ লাগিয়ে যাকে তাকে আঘাত করা হচ্ছে, পুলিশের কাছে সঁপে দেয়া হচ্ছে, কারো গান পছন্দ না হলে তাকে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও তরুণদের ভয় দেখানো হচ্ছে যেন তারা যে কোনো প্রগতিশীল চর্চা থেকে দূরে সরে থাকে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশও কি খুব স্বাভাবিক? ক্যাম্পাসগুলোতে এমন কিছু গোষ্ঠীর দাপট বাড়ছে যারা মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করতে চাইছে প্রকাশ্যেই। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলোও প্রায়ই সতর্ক করছে এই বলে যে, বাংলাদেশে মৌলবাদি উপাদানগুলো দ্রুত সংগঠিত হচ্ছে এবং তারা সুযোগ পেলেই ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সমাজকে বিভক্ত করতে চাইছে। অথচ এহেন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেই দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি হিসেবে একের পর নির্বাচিত করে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পর সর্বশেষে আমরা দেখলাম সদ্য সমাপ্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন— এখানেও একই শক্তি বিজয় লাভ করলো নিরংকুশ প্রধান্য নিয়ে।
কিন্তু সমাজের এরকম দূর্গতিশীল পরিস্থিতি দেখার পরও দেশের সচেতন তরুণ সমাজ কি সেভাবে তা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধে অপরাপর রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একসাথে নিয়ে মোকাবেলা করতে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে? এক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কোনরকম আশা জাগানিয়া ভুমিকা কি আমরা কেউ দেখেছি? যেখানে মৌলবাদি অপশক্তিগুলো মানুষকে ভয় দেখাতে চাইছে; ধর্মান্ধ তরুণরা একের পর এক ভাস্কর্য ভেঙ্গেই চলেছে; সংস্কৃতি, মানবতা, ভাষা, শিল্প, মুক্তচিন্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উঠেপড়ে লেগেছে—সেখানে এখনো আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল তরুণ কিংবা জনসাধারণ একসাথে দাঁড়িয়ে কি কখনো জোরালোভাবে প্রতিবাদ করেছে? তারা কি কখনো বলার চেষ্টা করেছে— বাংলাদেশ একটা ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক, প্রগতিশীল রাষ্ট্র, যেটি কোনো ধর্মের অপব্যবহারকারীদের কাছে কোনভাবেই আত্মসমর্পণ করবে না। বিগত ডিসেম্বর মাসেই এই পরাজিত শক্তির যে আস্ফালন আমরা দেখেছি, তা কেন আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেনা—এই ডিসেম্বর শুধু বিজয়ের স্মৃতি নয়— এটা সতর্কতার, প্রতিরোধের এবং নতুন করে জেগে ওঠার মাস।
ফলশ্রুতিতে এখন খুঁজে দেখার সময় হয়েছে বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি কারণে বিলুপ্ত হতে চলেছে। রাজনৈতিক বিভাজন বা রাজনৈতিক মতবিরোধ, কিংবা নোংরা ও প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির কালো থাবাই কি ভয়াবহভাবে বাঙালি জাতির এ অসীম সাহসিকতা এবং রক্তগাথা ইতিহাসকে বিভ্রান্তিরমুখে ফেলেছে? বিগত ৫৪ বছর ধরে ক্ষমতাবাজরা যে যেভাবে পারে আমাদের গর্বের অধ্যায়কে ইচ্ছামতো বিকৃত করেছে। এভাবেই সঠিক ইতিহাস বিকৃত এবং ম্লান করে দেয়ার প্রবণতাই কি তাদের মনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিরুপ চেতনার জন্ম দিচ্ছে? রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে এ গৌরবোজ্জ্বল সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার, আমাদের অস্তিত্ব।
সবশেষে আমাদের তরুণদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই— তারুণ্য কেবল একটি সময়ের নাম নয়, এটি একটি মানসিকতা, একটি শক্তি, যা পরিবর্তন আনতে পারে সমাজে, রাষ্ট্রে, এমনকি পুরো পৃথিবীতে। তারুণ্য মানে অদম্য স্পৃহা, যে স্পৃহা নতুন কিছু করার ইচ্ছায় দিনরাত পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করে। তারুণ্য হলো সেই সময়, যখন প্রতিটি মুহূর্ত নতুন অভিজ্ঞতা আর শেখার মাধ্যমে জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। যখন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস দেশ গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাফল্যও খুঁজে নেয় তার আপন পথ। তাই তারুণ্য মানে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে প্রতিটি বাঁধা ইতিবাচকভাবে শেখার নতুন সুযোগ এনে দেয়। তারুণ্য হলো সেই সময়, যখন পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নতুন কিছু করার সাহস সঞ্চয় করা হয়। তারুণ্য কখনোই উগ্র মৌলবাদকে আলিঙ্গন করে সমাজে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির পথ সৃষ্টিতে উৎসাহিত হয়না, বা অন্যদেরকেও করেনা।
মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও পলিসি এডভোকেট।