খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারিক ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষিত হয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যর্থ সামরিক আইন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টাকে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট জনাকীর্ণ আদালতে এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। এশীয় গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ কোরিয়ায় এই রায়কে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক গভীর রাতে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইউন সুক-ইওল আকস্মিকভাবে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, পার্লামেন্টে অবস্থানরত ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’ নির্মূল করার জন্য এই কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য। সেই ঘোষণার পরপরই সিউলের রাজপথে সাঁজোয়া যান এবং পার্লামেন্ট ভবনে সশস্ত্র সেনা মোতায়েন করা হয়। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সচেতন নাগরিক সমাজ এবং পার্লামেন্ট সদস্যদের দৃঢ়তায় সেই সামরিক আইন মাত্র ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। জাতীয় পরিষদে দ্রুত ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের এই আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত ইউনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পথ প্রশস্ত করে।
বিচারক জি গুই-ইয়ন তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ইউন মূলত পার্লামেন্টে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করার অভিপ্রায়ে এই ষড়যন্ত্র করেছিলেন। বিচারক বলেন, “সামরিক আইন জারির ঘোষণার ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজকে অপূরণীয় মূল্য চুকাতে হয়েছে। এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় পরিষদকে অকেজো করে দেওয়া।” আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করলেও বিবাদীর মধ্যে অনুশোচনার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
ইউন সুক-ইওলের বিচার ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | বিবরণ |
| বিবাদী | ইউন সুক-ইওল (সাবেক প্রেসিডেন্ট, দক্ষিণ কোরিয়া)। |
| মূল অভিযোগ | রাষ্ট্রদ্রোহিতা, বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সংবিধান লঙ্ঘন। |
| আদালতের রায় | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। |
| প্রসিকিউশনের দাবি | সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড। |
| ঘটনাকাল | ডিসেম্বর ২০২৪ (সামরিক আইন জারির প্রচেষ্টা)। |
| আইনি প্রেক্ষাপট | ১৯৯৭ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রয়েছে। |
প্রেসিডেন্ট ইউনের এই চরমপন্থি পদক্ষেপের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা। পার্লামেন্টে তার নিজ দল ছিল সংখ্যালঘু, যার ফলে বিরোধীরা বারবার তার প্রশাসনের বাজেট আটকে দিচ্ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বিচারকের মতে, ইউন ‘বিরোধীরা তাকে অকার্যকর করে দিচ্ছে’—এমন এক অমূলক ধারণায় আচ্ছন্ন হয়ে অসাংবিধানিক পথে পা বাড়িয়েছিলেন। তিনি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সহায়তায় পার্লামেন্ট ভবন দখল এবং সমালোচক সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের নীল নকশা করেছিলেন।
এই রায়ের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকে এই বার্তাই দিল যে, পদমর্যাদা যত বড়ই হোক না কেন, সংবিধান ও গণতন্ত্রের ঊর্ধ্বে কেউ নন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের এই আদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে একটি কঠোর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।