খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় প্রবাস থেকে কষ্টার্জিত পাঠানো টাকা এবং সেই অর্থ দিয়ে ক্রয়কৃত জমি বুঝে নিতে গিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক প্রবাসী ব্যক্তি। পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ার অপরাধে তাঁকে একটি নারিকেল গাছের সঙ্গে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অমানবিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত চাচা শ্বশুর আসাদ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের বাদলাকুড়া গ্রামের বাসিন্দা মহর উদ্দিনের মেয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত আব্দুল খালেকের ছেলে সোরহাব হোসেন বাবুর বিয়ে হয়। বিয়ের পর পরিবারের সচ্ছলতা ফিরাতে সোরহাব হোসেন দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে অবস্থান করেন। প্রবাসে থাকাকালীন সময়ে তিনি নিজের উপার্জিত অর্থ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে পাঠান। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে শ্বশুর মহর উদ্দিনকে নিজের নামে জমি কেনার জন্য নগদ ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার হিসেবে প্রদান করেন সোরহাব। এর পরবর্তী সময়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও পারিবারিক প্রয়োজনে শ্বশুরকে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার দেন ওই প্রবাসী জামাই। ফলে শ্বশুরের কাছে তাঁর সর্বমোট পাওনা দাঁড়ায় ৮ লাখ টাকা।
দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটিয়ে দেশে ফেরার পর সোরহাব হোসেন বাবু তাঁর শ্বশুর মহর উদ্দিনের কাছে পূর্বে দেওয়া ধারের টাকা ফেরত এবং প্রবাসের টাকায় কেনা জমির হিসাব চান। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বাদলাকুড়া গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার তাগিদ দেন। এ সময় শ্বশুর মহর উদ্দিনের সঙ্গে জামাই সোরহাবের তীব্র কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে শ্বশুরপক্ষের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সোরহাব হোসেনকে জোরপূর্বক আটক করেন। পরে তারা প্রবাসীকে বাড়ির আঙিনায় থাকা একটি নারিকেল গাছের সঙ্গে লোহার শিকল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন এবং লাঠিসোটা দিয়ে নির্মমভাবে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করেন।
এই বর্বরোচিত ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত করে নয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জানান, প্রবাসী জামাইয়ের কাছ থেকে ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং জমি কেনার জন্য শ্বশুর মহর উদ্দিন যে মোটা অঙ্কের টাকা ধার নিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ সত্য। সোরহাব হোসেন তাঁর পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য ইতিপূর্বে ইউনিয়ন পরিষদে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে আপস-মীমাংসার জন্য একাধিকবার বসার তাগিদ দিলেও শ্বশুরপক্ষের লোকজন তাতে সাড়া দেননি। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার দুপুরে টাকা চাওয়ার অপরাধে জামাইকে শিকল দিয়ে বেঁধে মারধর করার খবর পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে নালিতাবাড়ী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় সোরহাব হোসেনকে উদ্ধার করে এবং চিকিৎসার জন্য নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
এই নৃশংস নির্যাতনের ঘটনায় শুক্রবার সকালে ভুক্তভোগী প্রবাসীর স্ত্রী মরিয়ম বেগম বাদী হয়ে নিজের বাবা ও চাচাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে নালিতাবাড়ী থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মরিয়ম বেগম নিজের পরিবারের অন্যায্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বামীর ওপর হওয়া নির্যাতনের বিচার দাবি করেছেন।
নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুজ্জামান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, প্রবাসীর স্ত্রীর দায়ের করা এজাহারের ভিত্তিতে পুলিশ প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মামলার পরপরই এজাহারনামীয় আসামি এবং প্রবাসীর চাচা শ্বশুর আসাদ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি শ্বশুর মহর উদ্দিনসহ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য পলাতক আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।