খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে বৈশাখ ১৪৩২ | ১৫ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদীতে জেলেদের নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। গত পাঁচ মাসে এই গোষ্ঠী দেড় শতাধিক জেলেকে অপহরণ করেছে। এর ফলে নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন টেকনাফের প্রায় ৪০০ জেলে।
সরকারি ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে সোমবার (১৪ এপ্রিল) মধ্যরাত থেকে। তবে তার আগেই আরাকান আর্মির তৎপরতায় মাছ ধরা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন জেলেরা, ফলে তারা চরম অর্থকষ্টে পড়েছেন।
বাংলাদেশ–মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমানার মধ্যে নাফ নদীর জলসীমা পড়েছে ৮৪ কিলোমিটার। কিন্তু তিন মাস ধরে নাফ নদীর জলসীমায় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) টহল তৎপরতা বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে নাফ নদী থেকে জেলেদের ট্রলারসহ অপহরণের ঘটনাও বেড়েছে। জেলেরা এসব ঘটনার জন্য আরাকান আর্মিকে দায়ী করেছেন।
সর্বশেষ ৮ এপ্রিল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে টেকনাফের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অদূরে বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ জলসীমার মৌলভীরশীল নামের এলাকা থেকে অস্ত্রের মুখে চারটি ফিশিং বোটসহ ২৩ মাঝিমাল্লাকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এ ঘটনায় আতঙ্কিত টেকনাফের অন্তত ৪০০ ট্রলারের তিন হাজার জেলে পাঁচ দিন ধরে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আশিকুর রহমান জানান, গত ৮ ডিসেম্বর মিয়ানমারের মংডু দখলের পর আরাকান আর্মির তৎপরতা বেড়েছে। তারা ১৫১ বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে যায়, এর মধ্যে ১৩৪ জনকে বিজিবির প্রচেষ্টায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাকিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ২৩ জেলে অপহরণের বিষয়েও যোগাযোগ হচ্ছে এবং শিগগিরই ভালো খবর আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলেরা জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা স্পিডবোটে এসে অস্ত্রের মুখে ট্রলারসহ জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বন্দিদশা থেকে ফিরে আসা কিছু জেলের ভাষ্যমতে, আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও সম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যেই এই অপহরণ চালাচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘রাখাইন রাজ্য দখলের পর (গত ডিসেম্বর মাসে) আরাকান আর্মি নাফ নদীতে মাছ আহরণসহ নৌকা চলাচলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। এ বিষয়ে টেকনাফের জেলেদের সতর্ক করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশি জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে না পড়েন। তারপরও বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণের ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে।’
৪০০ ট্রলারের মাছ ধরা বন্ধ
রবিবার সকাল ১০টায় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ নৌঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দুই শতাধিক ট্রলার ঘাটে পড়ে আছে। দুপুরে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে জালিয়াপাড়ার ঘাটেও শতাধিক নৌকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নৌকার জেলেরা পাশের বেড়িবাঁধে ছেঁড়া জাল সংস্কার করছেন। সেন্ট মার্টিনের শতাধিক নৌকাও সাগরে নামছে না বলে খবর পাওয়া গেছে।
ট্রলারের জেলে আবদুল আমিন, নুর আলম, মোহাম্মদ হোসেন ও রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় তিন হাজারের বেশি জেলে অর্থসংকটে পড়েছেন। সংসার চালাতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
৮ এপ্রিল সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকে চারটি ট্রলারসহ ২৩ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এর মধ্যে শাহপরীর দ্বীপের আবদুল শুক্কুরের মালিকানাধীন একটি ট্রলারে জেলে ছিলেন ৫ জন, মোহাম্মদ শাওনের একটি ট্রলারে ৬ ও আবদুল হাকিমের দুটি ট্রলারে ১২ জন।
ট্রলারমালিক আবদুল শুক্কুর ও আবদুল হাকিম বলেন, জেলেদের সন্ধান মিলছে না। আরাকান আর্মি স্পিডবোটে এসে জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। সাগরে নেমে ২৩ জেলেকে অস্ত্রের মুখে রাখাইন রাজ্যের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় ধরে নিয়ে গেছে। সেখানে কী অবস্থায় আছে খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তাতে তাঁদের পরিবার উদ্বিগ্ন। আগে রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকার থাকতে মুহূর্তে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদলিপি ও পতাকা বৈঠক করা যেত। এখন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না।
সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, ১৫ এপ্রিল থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ আহরণের ওপর ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। ১০ থেকে ১২ হাজার জেলের পরিবারের দুঃখ–দুর্দশা আরও বাড়তে পারে। কারণ, আড়াই মাস ধরে জেলেরা তেমন মাছ আহরণ করতে পারেননি। মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় হাটবাজারে সামুদ্রিক মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
খবরওয়ালা/এসআর