খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ব্যক্তি খাতের আয়কর–কাঠামোতে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নতুন করকাঠামোয় তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে, যাঁদের বার্ষিক আয় ৩০ লাখ টাকার বেশি, সেই উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে করের দায় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
আজ রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত এক বাজেট পর্যালোচনা সংলাপে সিপিডি এই মূল্যায়ন তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জুনায়েদ সাকি)। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
বাজেটের বিভিন্ন খুঁটিনাটি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে সংলাপে আলোচনা করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ।
আয়ভিত্তিক করের দায় বৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্র
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন তাঁর প্রবন্ধে করদাতাদের আয় বৃদ্ধির অনুপাতে করের বোঝা বিশ্লেষণ করেন। তিনি দেখান যে, নতুন বাজেটে সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার উপেক্ষিত হয়েছে। প্রস্তাবিত করকাঠামো অনুযায়ী বিভিন্ন আয়সীমার মানুষের করের দায় বৃদ্ধির হার নিচে টেবিলের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হলো:
| করদাতার বার্ষিক করযোগ্য আয়ের সীমা | নতুন বাজেটে করের দায় বৃদ্ধির হার |
| ৬ থেকে ১৫ লাখ টাকা (মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত) | ১২.৫% থেকে ১৬.৭% (উচ্চ বৃদ্ধি) |
| ৩০ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে (উচ্চবিত্ত) | ৭.৬% (নিম্ন বৃদ্ধি) |
কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রা ও বাজেটের অসংগতি
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, প্রস্তাবিত বাজেটে তার কোনো সুস্পষ্ট বা সুনির্দিষ্ট প্রতিফলন নেই বলে মন্তব্য করেছে সিপিডি। ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রধান চার মন্ত্রণালয়—শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শিল্প এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ মোট ব্যয়ের তুলনায় হয় হ্রাস পেয়েছে অথবা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালী ইপিজেড ও জামদানি ভিলেজের মতো কর্মসংস্থানমুখী বড় বড় প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। যথাযথ সংস্কার এবং সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি গ্রহণ না করলে এই বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য কেবলই ‘রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা’ হিসেবে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনীতি
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বিদায়ী অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৩ শতাংশ। সিপিডির মতে, কেবল লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং বিচক্ষণ মুদ্রানীতির কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। নতুন সরকারের এই বাজেটে অর্থমন্ত্রী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে লক্ষ্য নিয়েছেন তা প্রশংসনীয় হলেও সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো অতি আশাবাদী বা অবাস্তব বলে মনে করে সংস্থাটি। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এই বরাদ্দের কার্যকর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি।