খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রকাশিত একটি তথ্য বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২১ সালের মে মাসে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। হত্যাকাণ্ডের শিকার তরুণ ইসমাইল হোসেন ওরফে ইমন ঢাকার একটি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নেপথ্যে ছিল প্রেম, বিচ্ছেদ এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো স্পর্শকাতর কিছু ঘটনা। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদর দপ্তর থেকে ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে যে গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে এই অপরাধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার ইমনের সঙ্গে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী তরুণীর পূর্বে একটি প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সময়ে তাঁদের কিছু অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ ছবি এবং ভিডিও চিত্র ইমনের কাছে সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কটি ভেঙে যায় এবং ওই তরুণীর অন্য একটি স্থানে বিবাহ ঠিক হয়। এই বিবাহের সংবাদ জানতে পেরে ইমন পুনরায় ওই তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। একই সঙ্গে ইমন তাঁর কাছে থাকা ঘনিষ্ঠ ছবি এবং ভিডিও চিত্রসমূহ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করেন। এই পরিস্থিতিতে নিজের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা এবং বিবাহ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় ওই তরুণী ইমনকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই হত্যা পরিকল্পনায় তরুণী তাঁর হবু স্বামী কামরুজ্জামান, আপন চাচা তোবারক ফরাজী এবং অন্য একজন তরুণীকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
২০২১ সালের ১৩ মে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন বিকেলে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। পুরো অপরাধটি সংঘটিত করতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট ফাঁদ প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ সম্পন্ন হতে আনুমানিক সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল।
নিচে এই হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিক সময়রেখা এবং বিবরণী একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | সময় | স্থান ও ঘটনাপ্রবাহ |
| ১ | বেলা ৩:৫০ মিনিট | শিবচরের ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ মাঠে ইমনের সঙ্গে মূল পরিকল্পনাকারী তরুণী এবং তাঁর সহযোগীর সাক্ষাৎ হয়। |
| ২ | পূর্ব প্রস্তুতি | সাক্ষাতের পূর্বে শিবচরের সূর্যনগর মোড় থেকে ঘাতক চক্রের অন্য সদস্যরা মূল তরুণীর কাছে একটি ধারালো ছুরি এবং ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কোমল পানীয় সরবরাহ করে। |
| ৩ | আড্ডা ও বিষপ্রয়োগ | কলেজ মাঠে আড্ডার একপর্যায়ে ইমনকে কৌশলে সেই ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কোমল পানীয়টি পান করানো হয়, যার ফলে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। |
| ৪ | স্থান পরিবর্তন | অচেতনপ্রায় ইমনকে একটি অটোরিকশায় করে পুরোনো ফেরিঘাটের নির্জন নদী তীরবর্তী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। |
| ৫ | চূড়ান্ত আঘাত ও হত্যা | নদীর পাড়ে বসে ছবি ও ভিডিও ফেরত দেওয়া নিয়ে তাঁদের মধ্যে পুনরায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তরুণী নিজে ছুরি দিয়ে ইমনের গলায় দুই বার আঘাত করেন। পরবর্তীতে তাঁর হবু স্বামী কামরুজ্জামান ছুরিটি নিয়ে পুনরায় উপর্যুপরি আঘাত করে ইমনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। |
| ৬ | লাশ গুমের চেষ্টা | অপরাধের আলামত ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তাঁরা দুজনে মিলে ইমনের মৃতদেহটি আড়িয়াল খাঁ নদে নিক্ষেপ করেন। |
হত্যাকাণ্ডের পরদিন অর্থাৎ ১৪ মে সন্ধ্যায় শিবচরের সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের খাসচর বাঁচামারা এলাকার আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে পুলিশ ইমনের গলাকাটা মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই নৃশংস ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৬ মার্চ একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে মামলাটির তদন্ত কার্য পরিচালনা করে শিবচর থানা পুলিশ। পরবর্তীতে মামলার জটিলতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে এর তদন্তের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর।
পিবিআই তদন্তভার গ্রহণ করার পর সূক্ষ্মভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ঈদের দিন ইমনের গতিবিধি এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ব্যক্তিদের তালিকা ও চলাচলের পথ নিখুঁতভাবে যাচাই করে। এই তদন্তের ভিত্তিতে মূল পরিকল্পনাকারী তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে এবং পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে ওই তরুণী নিজের অপরাধ স্বীকার করে এবং ইমনের ব্ল্যাকমেইল থেকে বাঁচতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে মর্মে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল এই ঘটনার বিষয়ে জানিয়েছেন যে, এটি কোনো আকস্মিক ক্ষোভ বা তাত্ক্ষণিক আবেগের বশবর্তী হয়ে ঘটানো কোনো অপরাধ ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সুপরিকল্পিত উপায়ে সংগঠিত একটি হত্যাকাণ্ড। ইমনকে মূলত পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দেখা করার কথা বলে ডেকে আনা হয়েছিল এবং এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি অভিযুক্ত ব্যক্তির আলাদা আলাদা সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করা ছিল। তাঁরা সকলেই একটি অভিন্ন উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই অপরাধটি সংঘটিত করেছেন।