কুসুম তাহেরা
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
একটা মানুষ আজ রাতে আর জেগে উঠবে না। রাতের খাবার শেষে ঘুমিয়ে পড়বে, আর চিরতরে নিথর হয়ে যাবে। কেউ জানবে না কেন মাণিক্য সেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে চাইল। কেউ কখনো খুঁজবে না সেই উত্তর। তাকে যারা এই সমাজে এনেছিল একটু আশ্রয়ের, একটু শান্তির আশায়, তারা কেউ কথা রাখেননি। যারা বলেছিল, সময় বদলাবে, মানুষ বদলাবে— তারাও ছিল মিথ্যা। সত্যি ছিল কেবল এই নিষ্ঠুরতা, একঘরে করে দেওয়ার আয়োজন। এই সমাজের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল মাণিক্য সেনের।
তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা তিলে তিলে বোঝাল, এই সমাজে তার জায়গা নেই। কালিহাতী টাঙ্গাইলের এক মফস্বল শহর। সেখানে এক হাইস্কুলে ইতিহাস পড়ান মাণিক্য সেন। বয়স প্রায় চল্লিশের কোঠায়। লম্বা চেহারা, গভীর চোখ, কাঁধে সব সময় একটা কাপড় জড়িয়ে রাখেন। মুখে গম্ভীরতা আর গলায় শান্তস্বরে কথা বলার অভ্যাস। শিক্ষকতা তার পেশা নয়, ধ্যান। ইতিহাসের গল্প তিনি এমনভাবে বলতেন, মনে হতো সামনে সেই যুদ্ধ, সেই সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এর বাইরেও মাণিক্য সেনের একটা ভিন্ন পৃথিবী ছিল, যা তিনি দিনের আলোয় দেখাতেন না। একটি জীবন, যেখানে সে ভালোবাসত। ভালোবাসত একজনকে। অরাধ্য! তার স্কুলের ছাত্র ছিল না, সহকর্মীও নয়। ছিল কালিহাতীর পাশের গ্রামের এক যুবক। যেখানে টিউশনি করাতেন মাণিক্য। টিউশনিতে কখন যেন এ কথা-সে কথা থেকে চাহনি, আর চাহনি থেকে স্পর্শে পৌঁছেছিল তারা—সেটা মাণিক্য সেন নিজেও জানেন না।
অরাধ্য ছোট হলেও বয়সের ব্যবধান যেন ঘুচে গিয়েছিল চোখের দৃষ্টিতে। তার চোখে মাণিক্য দেখেছিল সম্মান, বিশ্বাস আর সেই নির্ভরতা, যা সে সারা জীবন খুঁজে ফিরেছিল। কখনো ছুটির দিনে তারা কাছের নদীর ঘাটে বসে থাকত, কখনো সন্ধ্যার পর বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত পাশাপাশি। অরাধ্য মাণিক্যের হাত ধরত। শুধু ধরত না, শক্ত করে চেপে রাখত, যেন কোনো ঝড় এলেও এই হাত ছেড়ে যাবে না। নিশ্বাসে নিশ্বাসে ফুল হয়ে উঠত যুগল ঠোঁটের স্পর্শ। কিন্তু ঝড় এসেছিল। সেই দুপুরে, যখন অরাধ্য এসেছিল মাণিক্যের বাড়িতে। প্রায়ই আসত, কিন্তু সেদিন অন্য রকম ছিল।
দুজনই জানত— এই সমাজ তাদের মেনে নেবে না। কিন্তু প্রেম তো মানে না সমাজের নিয়ম। সেদিন তারা প্রথমবার একে অপরকে শরীরে ধারণ করেছিল। তাদের স্পর্শে ছিল উন্মাদনা, ছিল স্বস্তি, ছিল দীর্ঘদিনের না-বলা কথা। অরাধ্য মাণিক্যের গাল ছুঁয়ে বলেছিল, ‘আপনার শরীরটা আমার আশ্রয়, স্যার।’ মাণিক্য বলেছিল, ‘আমি তো স্যার নই তোমার কাছে, অরাধ্য। আমি শুধু মাণিক্য।’ ছুটির দুপুরে, স্কুলের এক ছাত্র আসে সাজেশন নিতে। ভাবছিল শর্টকাটে পরীক্ষা পেরোবে। বাড়ির সামনে দরজায় কড়া নাড়ল, সাড়া নেই। পা টিপে টিপে পেছনের দিকে গিয়ে আধভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল— ‘স্যার কি ঘুমিয়ে আছেন?’ না। যা দেখল, তাতে তার মাথা ঘুরে গেল। ভয়ে পালানোর কথাও ভুলে গেল সে। খাটে শুয়ে থাকা, শক্তসমর্থ, পুরুষালি মাণিক্য সেন আরেক নাদুসনুদুস পুরুষকে জড়িয়ে গভীর চুম্বনে মগ্ন। দুজনেই পোশাকহীন! এই ছোট মফস্বল শহরে আগুনের থেকেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ‘পাপাচারের’ খবর। সর্বত্র ঢি ঢি পড়ে গেল।
যদি কোনো নারীর সঙ্গে এমন দৃশ্য দেখা যেত, তবে তা হতো ‘কেচ্ছা’। অবিবাহিত মাস্টার যদি কোনো নারীকে জড়িয়ে ধরতেন, তবে সেটি ‘অপরাধ’। কিন্তু এই সম্পর্ক ‘পাপ’। লগি-বইঠা হাতে নামল মানুষ। সভা বসাল, সালিস বসল। শিক্ষকের ‘বিকৃত’ আচরণ নাকি ছাত্রছাত্রীদের নীতিবোধ ধ্বংস করে দিচ্ছে। অভিভাবকদের সঙ্গে যোগ দিলেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। তাদের চোখে মাণিক্য সেনের থেকে হাজার ভোটের দাম অনেক বেশি। ডেপুটেশন গেল জেলা দপ্তরে— এই শিক্ষকের বদলি চাই। কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল শেখ অন্য কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘এটি অন্যায় বা বিকৃতি নয়।’ সমলিঙ্গের প্রেম মানবসভ্যতার প্রাচীন সত্য। এটি শরীরবিজ্ঞানেরই এক রূপ। যে হরমোনের জোয়ার-ভাটায় নারীর শরীর কামনা করে পুরুষ এবং ঘটে উল্টোটাও। সে রকম হরমোনের কারসাজি এটিও। বহু সত্য যেমন মানুষের মানতে দেরি হয়েছে, নিত্যদিন হয়, ভবিষ্যতে হবে, এ-ও তা-ই।
বরং অন্যায় করেছে সেই ছাত্রটি— ‘কোনো অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত জায়গায় উঁকি দেওয়া ঠিক হয়নি।’ প্রধান শিক্ষকের এই ব্যাখ্যা আরও আগুন ঢেলে দিল। সহকর্মীরাও প্রতিবাদীদের দলে যোগ দিলেন। শিক্ষক সমাজের মর্যাদা, নৈতিকতা— সব তারা দেখছে ভূলুণ্ঠিত। শুরু হলো বহিষ্কারের দাবিতে চিঠি পাঠানো। কিন্তু কোনো আইনি অভিযোগ নেই। কেউ বাদী হয়নি। তাহলে কীভাবে বহিষ্কার করবে? শিক্ষা বিভাগ মুশকিলে পড়ল। রুটিন বদলি করতে চাইলেও, কোথায় পাঠাবে? অপবাদ তো সর্বত্রই ছড়িয়ে গেছে। অশিক্ষিত সমাজের কুসংস্কার থেকে রেহাই নেই কোথাও। শেষমেশ জট পাকাল আরও। বদলির বদলে হলো বয়কট। টিচার্স রুমে, পাড়ায়, ক্লাসরুমে মাণিক্য সেন একঘরে। প্রিয় শিক্ষককে ক্লাসে দেখতে চায় না ছাত্ররা।
অভিভাবকেরা স্কুলে পাঠানো বন্ধ করল। স্কুলের গেটে সাঁটানো হলো অশ্লীল পোস্টার। এই চাপ আর নিতে পারলেন না মাণিক্য সেন। চাকরি ছাড়লেন। ফিরে এলেন নিজের নিঃসঙ্গ বাড়িতে। এক রাতে কীটনাশক পান করলেন। শেষ হয়ে গেল জীবনের অধ্যায়। ভয়াবহ বনজোছনায় নিথর হয়ে রইল তার দেহ। নিষিদ্ধ প্রেমের এক শূন্য সাক্ষ্য হয়ে। আর অরাধ্যের চোখে এখনো জ্বলজ্বল করে সেই দিনের বনজোছনার আলো। যেখানে এক নিষিদ্ধ প্রেম হারিয়ে গিয়েছিল। যেখানে মাণিক্য সেন এখনো বেঁচে আছেন। কোনো লজ্জা নয়, কোনো ছায়া নয়— পূর্ণিমার আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠেন মাণিক্য সেন।