রুহুল মাহফুজ জয়
প্রকাশ: রবিবার, ৩০ মার্চ ২০২৫
তমসাতীর্থে
৫.
তোমার ছুটির দিন, বিকাল তিনটায় সন্ধ্যা নেমে
আমাকে পরাভূতির অন্ধকারে ঠেলে নিয়ে যায়।
ভাবি, রেডব্রিজ আর বার্কিংয়ের মাঝে এক ট্রেন
দূরত্ব পেরোতে না পারার ব্যর্থতাতে বিহ্বল এ
প্রেমের গরিবি মৃত্যু হবে, বা তোমার সতর্কতা
ধরে ঝুলে র’বে আমাদের অচেতন যোগাযোগ—
নুড়ি ও পাথর কী রকম সমুদ্রের সখা, সহচর
সৈকতে সৈকতে ঘোরে—এ প্রণয় পানিকে ঠকিয়ে
ঘটে না সফেন তীরে। জলজ লীলার নুড়িকেও
আমি আজ ঈর্ষা করি, ঢের মাখামাখিসহযোগে
ওরা পাড়ি দিতে পারে মহাপৃথিবীর চঞ্চলতা
হিমের ভেতরে রোজ—অথচ মানবজনমের
ক্যারাভানে চড়ে আমি তোমার স্পর্শের গন্ধলিপি
ছুটির দিনেও লিখে ফেলার অনুমতি পাই না।
৬.
কাজু খেতে খেতে আমাদের জলতরি ভ্রমণের স্মৃতি মনে পড়ে
সুচতুর খাজুরাহো এসে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দাঁড়ায়, থির বল্লম
উঁচিয়ে নিষেধ আসে, বলে : ‘সাইলেন্ট ঘুঘু, রাত্রি ঢের দূরে,
এখন সময় নয় লারেলাপ্পা খেলার অথবা নদী জাগাবার—’
ঝাঁপিয়ে পড়ার বিদ্যা কে কবে শিখিয়েছিল তা অপ্রাসঙ্গিক,
সময় নিজের পক্ষে নিতে জানলে রাতও সূর্যের,
দিনও প্রচুর রাত্রিগন্ধি, পানিকেও বানের লালসা
দেওয়া যায় ইচ্ছেমতো—ক্রীড়ার চাতুর্য গোপিনীরও বটে,
কেবল কৃষ্ণের নয় একা—এ কথা কি জানো নাই হে বিরোধ!
মনে পড়ে আমাদের জলতরি ভ্রমণের স্মৃতি, কাজু খেতে খেতে
যে ঝাঁপাবার, সে ঝাঁপাবেই, এ নিগূঢ় সত্য অস্বীকার ক’রে
কত আর ইসরায়েলেড ভূমিকায় ঢুকে যাবা
প্রেমীদের ঘরে, বলবা : ‘ক্রন্দনই যৌনতার বাড়ি’—
কপিলা কুবের সহে কিংবা কুবের কপিলার ধারাপাত
মুখস্থ করেই তরি ভাসায়েছে,
গেছে দ্বীপান্তরে—জানো নাই বুঝি!
জলতরি ভেসে যেতে যেতে তোমাদের পানি হওয়া
দৃশ্যগুলি কোন অসিলায় জানি মনে পড়ে স্ব-খুনের পরে।
৭.
দেখেছি আবার দেখি নাই যেন তারে মমির ভেতরে, তবু তার
দৃষ্টি স্খলনের চেয়ে উজ্জ্বল কামের পাহারায় চেয়ে থাকে,
ক্ষত থেকে ঝরা ফিনকি রক্তের মতন উচ্ছ্বলতা আত্মা হ’তে
আত্মায় আত্মায় উছলায় এই ভরা দহনের ঢেউ, কলহের তালে—
না শিকড়ে, না শিখরে—কোথাও যেতে না পারার স্থিরতা আমি
শিখেছি মমির ভেতরে দেখা নিঃস্পৃহ চোখ জোড়া থেকে, আর
বানিয়ে নিয়েছি নিজস্ব ডানা, ওড়ার বাহানা, একাকি বাঁচা—
কী করে আমায় পাপ ও পুণ্যের সহমর্মী জাহাজের ডেকে
আবিষ্কার করবে তুমি, সে পথ ছেড়ে এসেছি অযুত বছর—
যদিও মরুর সেই পাখিটার চরিত্রে উপনীত হবার
তাড়না আমায় নিয়ে আসে তোমার নিকটে, তান, যার সব
শ্রম একদিন বৃষ্টি হবে আর প্রিয়তমার সাথে নাচবে খুব—
বছর ফুরিয়ে যায়, মরুভূমি হয়ে ওঠে আরও রুক্ষভাষী,
না আসে পানির ধারা, না প্রেয়সী—পড়ে রয় ভালোবাসার ঘর—
ও করুণ, ও হরিণা, তোমার নীরব চাহনিতে মৃত্যু লেখা,
দেখেও যে দেখে নাই, তার দিকেই ছুড়ি মমির অভিশাপ।