বাংলাদেশ আজ হারাল এক অনন্য মুক্তিযোদ্ধাকে—বীর উত্তম এ কে খন্দকারকে, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের স্বাধীন দেশের সৃষ্টিতে অতুলনীয় অবদান রেখেছিলেন। দেশের বিজয়ের মাসেই তার মৃত্যু জাতিকে গভীর শোকমগ্ন করেছে।
ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন্স (আইএসপিআর) জানিয়েছে, শনিবার সকাল ১০:৩৫ মিনিটে বয়সজনিত কারণে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।)
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এ কে খন্দকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এয়ার ফোর্স চিফ হিসেবে নিয়োগ পান এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বিমান বাহিনী পুনর্গঠন করেন। পরে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করেন এবং দুইবার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস শোকপ্রকাশ করে বলেন, “এ কে খন্দকার ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় সৈনিক। তিনি ছিলেন দৃঢ়, সাহসী, দেশপ্রেমিক এবং আদর্শবান। তার জীবন, কর্ম ও নীতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিরকালের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।”
১৯৩০ সালে রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন এ কে খন্দকার। তিনি পাবনার বরা উপজেলার পুরানা ভরেঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকulation ও ১৯৪৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ১৯৫২ সালে পাকিস্তান এয়ার ফোর্সে কমিশন পান। গ্রুপ ক্যাপ্টেনের পদবিতে উন্নীত হয়ে তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের দ্বিতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালান এবং ঢাকার রেসকোর্স গ্রাউন্ডে ১৬ ডিসেম্বরের ইতিহাসস্মৃতির আত্মসমর্পণে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি বিমান বাহিনীর প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অসাধারণ সেবার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৩ সালে ‘বীর উত্তম’ এবং ২০১১ সালে স্বাধীনতা পদক অর্জন করেন। এছাড়া তিনি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সেনাবাহিনী ছাড়াও তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের সরকারে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে পুনরায় মন্ত্রী পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ ‘১৯৭১: ইনসাইড অ্যান্ড আউটসাইড’ রচনা করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
বীর উত্তম এ কে খন্দকারের মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য এক বিপুল ক্ষতি। একজন নির্ভীক যোদ্ধা, নিবেদিত নেতা ও দেশপ্রেমিক রূপে তার অবদান চিরকাল ইতিহাসে স্মৃতিস্মরণীয় থাকবে।



