মোঃ ফারুক আহম্মেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিল্পায়ন, রপ্তানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। তবে এই অগ্রগতির অন্তরালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—উন্নয়ন এখনো সমানভাবে বিস্তৃত হয়নি; বরং দেশের আর্থিক কর্মকাণ্ড এবং বিনিয়োগ প্রবাহ সীমিত কয়েকটি নগরকেন্দ্রকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ব্যাংক-এর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন (অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৫) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২০,০৫,৩৩৮ কোটি টাকা এবং মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭,৭৭,৩১৬ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থপ্রবাহ দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু এর ভৌগোলিক বণ্টন গভীর বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।
নগর বনাম গ্রাম: বৈষম্যের মূল চিত্র
দেশের মোট আমানতের প্রায় ৮৪ শতাংশ শহরাঞ্চলে, যেখানে গ্রামাঞ্চলের অংশ মাত্র ১৬ শতাংশ। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও প্রকট—প্রায় ৯২ শতাংশ ঋণ শহরকেন্দ্রিক, আর গ্রামাঞ্চলের অংশ সীমাবদ্ধ ৭–৮ শতাংশে।
এতে স্পষ্ট যে ব্যাংকিং সেবা, বিনিয়োগ ও ঋণ সুবিধা প্রধানত শহরেই কেন্দ্রীভূত। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক বৈষম্য: ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনীতি
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান আঞ্চলিক বৈষম্যের আরও সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে—
বিভাগ
আমানত (%)
ঋণ (%)
ঢাকা
60.32
67.34
চট্টগ্রাম
21.36
19.40
খুলনা
4.41
3.74
রাজশাহী
4.18
3.72
সিলেট
4.00
1.07
বরিশাল
2.02
1.10
রংপুর
2.03
2.30
ময়মনসিংহ
1.68
1.33
এই তথ্য থেকে দেখা যায়, একাই ঢাকা বিভাগ দেশের মোট আমানতের ৬০ শতাংশের বেশি এবং ঋণের প্রায় ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ দেশের আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু এখনো ঢাকা।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ঢাকার সঙ্গে ব্যবধান অনেক বেশি। সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং শিল্পায়নের কারণে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
খুলনা ও রাজশাহী মাঝারি অবস্থানে থাকলেও সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহের অংশ অত্যন্ত কম, যা আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
বৈষম্যের কাঠামোগত কারণ
এই অসমতার পেছনে রয়েছে কয়েকটি গভীর কাঠামোগত কারণ—
শিল্প ও কর্পোরেট কেন্দ্রিকতা: অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট সদরদপ্তর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঢাকাকেন্দ্রিক।
বন্দরনির্ভর অর্থনীতি: চট্টগ্রাম বন্দরের কারণে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।
অবকাঠামোগত সুবিধা: উন্নত সড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও দক্ষ জনবল বড় শহরে বেশি সহজলভ্য।
বিনিয়োগের প্রবণতা: বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহী।
শিল্পের ভৌগোলিক ঘনত্ব: তৈরি পোশাক শিল্প মূলত গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
সম্ভাব্য প্রভাব: কেন এটি উদ্বেগজনক
এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে—
১. আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি
উন্নয়ন সীমিত অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হলে অন্যান্য অঞ্চল পিছিয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
২. গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতা
ঋণ ও বিনিয়োগের অভাবে স্থানীয় শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারে না।
৩. অতিরিক্ত নগরায়ণ
গ্রাম থেকে শহরে মানুষের ঢল বাড়ে, ফলে আবাসন, যানজট ও দূষণ সমস্যা তীব্র হয়।
৪. অবকাঠামোর ওপর চাপ
ঢাকার মতো শহরে বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
৫. জাতীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা সীমিত হওয়া
অন্যান্য অঞ্চলের কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবসম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো প্রথমে বড় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন করলেও পরবর্তীতে শিল্প ও বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে।
করণীয়: ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের পথ
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি—
শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ: বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে নতুন শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি: গ্রামে সহজ শর্তে ঋণ, এসএমই ফাইন্যান্স ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ
অবকাঠামো উন্নয়ন: সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার
স্থানীয় উদ্যোক্তা উন্নয়ন: কৃষিভিত্তিক ও ক্ষুদ্র শিল্পে প্রণোদনা
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: সরকারি সেবা ও প্রতিষ্ঠান রাজধানীর বাইরে সম্প্রসারণ
উপসংহারে বলা যায় ,
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এর ভৌগোলিক বণ্টনে স্পষ্ট অসমতা বিদ্যমান। যদি উন্নয়ন ঢাকা ও চট্টগ্রাম-এর মতো কয়েকটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
সুতরাং, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমানভাবে অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে—ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে, সমতার ভিত্তিতে।
লেখকঃ সিনিয়র ব্যাঙ্কার।