খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দুই দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে বীমা সুবিধা না থাকা বা বীমাছাড়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪১.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস (Moody’s)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
মুডিসের প্রতিবেদনটিতে একটি বড় সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘বীমা সুরক্ষা ঘাটতি’ (Insurance Protection Gap)। সহজ কথায়, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বীমা কোম্পানিগুলো প্রকৃতপক্ষে যে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেয়—এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান বা ঘাটতি দিন দিন আরও বড় হচ্ছে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, এই ক্রমবর্ধমান ঘাটতি এখন বিশ্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করছে। যেহেতু এই বীমাছাড়া ক্ষতিগুলো নিজে থেকে মিলিয়ে যায় না, তাই এই বিশাল আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সার্বিক উন্নয়ন সরাসরি বাধার মুখে পড়ছে।
সংস্থার উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বীমা সুরক্ষার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে। এসব অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবেই বীমা করার প্রবণতা অনেক কম। এর ওপর আবার এই অঞ্চলের ঝুঁকিগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত হলেও এবং উচ্চমূল্যের সম্পদ তৈরি হলেও, সেই গতিতে বীমা কভারেজের পরিধি বাড়ছে না। ফলে সম্পদ বাড়ার সাথে সাথে ঝুঁকির মাত্রাও বহুগুণ বেড়ে চলেছে।
উন্নত এবং উন্নয়নশীল অঞ্চলের মধ্যে এই বৈষম্যের চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এশিয়া-প্যাসিফিক বা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ০.৮৩ শতাংশের সমপরিমাণ সম্পদ বীমার আওতায় সুরক্ষিত থাকে। এর বিপরীতে শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট বা জি-৭ (G7) ভুক্ত দেশগুলোতে এই হার প্রায় তিন গুণ বেশি। উন্নত এই দেশগুলোতে জিডিপির গড়ে ২.৩৮ শতাংশ সম্পদ বীমা কভারেজের আওতায় থাকে।
তীব্র আবহাওয়াজনিত এই আর্থিক ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মানুষের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি। মুডিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে মানুষের বসবাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ২৭০ কোটি মানুষ এমন সব এলাকায় বসবাস করছে যা সরাসরি বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে এটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় প্রতি তিনজনে একজন। বিপুল পরিমাণ এই জনগোষ্ঠী ও তাদের সম্পদ যেকোনো বড় দুর্যোগে চরম অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বড় সংকটে ফেলতে পারে।