বেসরকারি দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম!

বেসরকারি দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার কোটি টাকা অনিয়মের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগে ঢাকার শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। নর্দার্ন ইউনিভার্সিটিতে ৫০০ কোটি টাকা অনিয়মের তদন্ত শুরু হয়েছে।

এদিকে নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ও বর্তমান ট্রাস্টিদের দখলযুদ্ধে থমকে গেছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের ছয় দাবি তোলার পরিপ্রেক্ষিতে জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ বন্ধ ঘোষণা করে পালিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত ভিসিসহ দুর্নীতিবাজ প্রশাসন। প্রতিবাদে গত শুক্রবার সকাল থেকে দিনভর বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বিক্ষোভের মুখে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)।

গত মঙ্গলবার (১৩ মে) বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে অনিয়মের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চলছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিধি লঙ্ঘন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৩৪৩ কোটি টাকা শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১০২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।’

এছাড়া নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।

অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারে জড়িত। জানা গেছে, এই সম্পদের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের তদন্ত করবে দুদক।

বেসরকারি নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতার নেপথ্যে রয়েছেন দুই জন ট্রাস্টি সদস্য মো. বোরহান উদ্দিন ও মো. লুত্ফর রহমানকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর ঘটনা।

বোরহান উদ্দিন বলেন, ২০১১ সালে তাদেরকে পদত্যাগ করতে চাপ সৃষ্টি করেন আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ। এক্ষেত্রে তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপ ছিল। প্রাণনাশেরও হুমকি ছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে জীবন বাঁচাতে তারা পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। অথচ প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্টি ছিলেন তারা।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা ‘বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যসংখ্যা ছিল সাত জন। তারা হলেন,—১. মো. আবুবক্কর সিদ্দিক, ২. মো. লুত্ফর রহমান, ৩. মো. বোরহান উদ্দিন, ৪. আবু আহমেদ, ৫. মিসেস আয়েশা আকতার, ৬. মো. রেজাউল করিম ও  ৭. প্রফেসর ড. এম শামছুল হক।

সাত জন সদস্য সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য ৫ কোটি টাকা এফডিআর প্রদান করেন। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পরে আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহর সঙ্গে চুক্তি হয় এবং চুক্তির প্রধান শর্ত ছিল তিনি তাৎক্ষণিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করবেন। বিনিময়ে তিনি বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য হবেন। তবে চুক্তির পরই ঋণ পরিশোধ না করে, আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ উদ্যোক্তা সাত সদস্যের মধ্যে ছয় জনের নাম বাদ দিয়ে বহিরাগত আট জন সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্ত করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করেন এবং নতুন বোর্ড অব ট্রাস্টি গঠন করেন। এর মাধ্যমে মূলত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি দখল করেন।

জীবন বাঁচাতে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে বোরহান উদ্দিন ও লুত্ফর রহমান পদত্যাগে স্বাক্ষর করেন। গত বছর ৫ আগস্টের দুই দিন পরই বোরহান উদ্দিন ও লুত্ফর রহমান তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীদের দিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেন বলে অভিযোগ করেন ঐ দুই জন।

এদিকে ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহসহ সদস্যদের অভিযোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা পুঁজি করে একটি চক্র বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে লুটপাট করেছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় দখলে নিতে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের নামে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা করেছে। তারা বলেন, বোরহান ও লুত্ফর মূলত নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতে ট্রাস্টি সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত সীমাহীন দুর্নীতির দায়ে ২০১১ সালে তারা পদত্যাগ করেন। এ সময় তাদের দুই জনকেই কোটি টাকা দেয় নতুন বোর্ডের সদস্যরা। বোরহান ও লুত্ফর নিজ ইচ্ছায় সব কাগজে স্বাক্ষর করেন।

এ ব্যাপারে মো. লুত্ফর রহমান ও বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কোনো হামলা করিনি, কেবল কথা বলতেই গিয়েছিলাম। অথচ আমাদের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়, মামলা হয়, জেলেও যেতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় জনপ্রিয়তা অর্জনের পর ৯টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। আমরা কেন পদত্যাগ করতে যাব?’

সূত্র: ইত্তেফাক

খবরওয়ালা/এমইউ
 

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।