খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ২২ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির ১২ দিন পেরিয়ে গেছে। যদিও আপাতত গোলাগুলি বন্ধ, তবুও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে যার সরাসরি কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
গত ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পর ভারত সীমান্ত ও নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে থাকা নয়টি লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক অভিযান চালায়। ভারত দাবি করে, ওইসব লক্ষ্যবস্তু ছিল “সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি”।
এর জবাবে পাকিস্তান ড্রোন হামলা চালায় বলে ভারতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। সংঘর্ষের সময় ও পরে দুই পক্ষ থেকেই উঠে এসেছে পাল্টাপাল্টি দাবি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
পহেলগাম হামলার রহস্য
জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন কাশ্মীরি ও দু’জন পাকিস্তানি। এদের পরিচয়—আদিল হুসেন ঠোকার, হাশিম মুসা ওরফে সুলেমান এবং আলি ভাই ওরফে তালহা ভাই। তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ লাখ টাকার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন, “সন্ত্রাসীরা আমাদের বোনেদের সিঁদুর মুছে দিয়েছে। তাই ভারত এই সন্ত্রাসের সদর দফতরই ধ্বংস করেছে।” তাঁর দাবি, ওই অভিযানে শতাধিক সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।
তবে এখনো স্পষ্ট নয়, ওই পহেলগাম হামলাকারীদের বাস্তবিক কী হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্লেষকেরাও।
‘সন্ত্রাসবাদের কাঠামো ধ্বংস জরুরি’
ভারতের সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জীবন রাজপুরোহিত বলেন, “এই সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা কঠিন, কারণ তাদের স্থানীয় সমর্থক রয়েছে এবং তারা পাকিস্তানের সাহায্যও পায়। তাই শুধু সন্ত্রাসীদের হত্যা নয়, তাদের পুরো কাঠামো ধ্বংস করাও জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “সন্ত্রাসবাদ একটা মতাদর্শ, যার মূল পাকিস্তানে। কয়েকজনকে মারলেই সেটা শেষ হবে না। আমাদের কৌশলগতভাবে গোড়া থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করতে হবে।”
বেসামরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি চলার সময় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারদের উচিত ছিল সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া।
এয়ার মার্শাল (অব.) দীপ্তেন্দু চৌধুরী বলেন, “এই এলাকায় বাংকার, সতর্কতা ব্যবস্থা, ব্ল্যাকআউট পরিকল্পনা ইত্যাদি আগে থেকেই থাকে। তবে পূর্ণ যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলে মানুষকে সরানো হয়। এবার যেহেতু তাৎক্ষণিক গোলাগুলি শুরু হয়েছিল, তাই আগেভাগে সরানোর সুযোগ ছিল না।”
রাফাল ভূপাতিত?
পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা ভারতের একটি রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। তবে ভারত সরকার এই দাবি অস্বীকার কিংবা নিশ্চিত—কোনোটাই করেনি।
পাম্পোর এলাকায় একটি ধাতব টুকরো পাওয়া গেলেও সেটি ভারতীয় বিমানের কি না, তাও নিশ্চিত করা হয়নি।
এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এয়ার মার্শাল একে ভারতী বলেন, “আমরা কি আমাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করেছি? উত্তর হলো—হ্যাঁ।” তিনি বলেন, সব পাইলট দেশে ফিরেছেন, তবে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখন জানানো সম্ভব নয়।
এয়ার মার্শাল চৌধুরীর মতে, “সেনাবাহিনীর ক্ষতি হবে—এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কি সন্ত্রাসের শিকড়ে আঘাত হানতে পেরেছি?”
যুদ্ধবিরতির পেছনে কার ভূমিকা?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতার ফলেই ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে ভারত জানায়, পাকিস্তানের ডিজিএমও-র (মিলিটারি অপারেশন প্রধান) উদ্যোগেই যুদ্ধবিরতি হয়েছে।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক দিলীপ সিংয়ের মতে, “সম্ভবত পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে পাকিস্তান নিজে ভারতকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। ভারতের দিক থেকে সম্মতি আসার পরই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।”
তিনি বলেন, “ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা জরুরি। এই সম্পর্ক কেবল ট্রাম্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।”
বর্তমান যুদ্ধবিরতির মাঝে কাশ্মীর সীমান্তে শান্তি আপাতত ফিরলেও, অজস্র প্রশ্ন ও সংশয় এখনো রয়ে গেছে। সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন, বেসামরিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এ সংঘর্ষ কেবল শুরু, এর প্রকৃত পরিণতি সময়ই বলবে।
খবরওয়ালা/এমেজড