খবরওয়ালা মফস্বল ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ২৭ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার একটি গ্রামে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তির অভিযোগে এক কিশোরকে (১৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় উত্তেজিত জনতা গতকাল শনিবার (২৬ জুলাই) রাত ও আজ রবিবার (২৭ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত ওই কিশোরের বাড়ি এবং সনাতন সম্প্রদায়ের ১৫টি বসতঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিকেলে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত কিশোর একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় পর্বের শিক্ষার্থী এবং তার বাড়ি গঙ্গাচড়ার বেদগাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামে। পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পায় যে, সে ফেসবুকে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর লেখা ও ছবি পোস্ট করেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর, পুলিশ রাত সাড়ে আটটার দিকে কিশোরটিকে আটক করে এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে সম্মিলিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরকে থানায় নেওয়ার পর তার বিচারের দাবিতে উত্তেজিত জনতা মিছিল নিয়ে তার বাড়ির সামনে যায়। রাত ১০টার দিকে আরও একটি মিছিল এসে কিশোরের এক স্বজনের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। থানা-পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গঙ্গাচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল এমরান জানান, গত রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান করেছিল। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তারা চলে আসে। তবে আজ দুপুরে বিশেষ করে জোহরের নামাজের পর হাজার হাজার লোক ওই এলাকায় যাওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বেলা ১টা থেকে ৩টার মধ্যে উত্তেজিত জনতা কিশোরের গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এই সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্যও আহত হন এবং একজন কনস্টেবল গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
বিকেল নাগাদ ঘটনাস্থলে পুলিশ আলদাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে ৫০০ গজ দূরে উত্তেজিত জনতা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হামলাকারীরা পিছু হটে। পরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ১৪টি বসতঘর ভাঙচুর করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রমোদ মোহন্ত জানান, গ্রামটি নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার সীমানায় অবস্থিত। দুপুরে কিশোরগঞ্জের বাংলাবাজার থেকে খিলালগঞ্জে মানববন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তবে গঙ্গাচড়া থানা-পুলিশ জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা শুধু মানববন্ধন করবে এবং গঙ্গাচড়ার দিকে আসবে না। কিন্তু বেলা ৩টার দিকে উত্তেজিত জনতা খিলালগঞ্জ বাজার থেকে স্লোগান দিতে দিতে গঙ্গাচড়ার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা চালায়।
ওই এলাকার মেম্বার পরেশ চন্দ্র বলেন, ‘রবিবার দুপুরে গ্রামের পাশে কিশোরগঞ্জের বাংলাবাজার থেকে খিলালগঞ্জে মানববন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, তারা শুধু মানববন্ধন করবে, কারও বাড়ির দিকে আসবে না। কিন্তু বিকাল ৩টার দিকে উত্তেজিত জনতা খিলালগঞ্জ বাজারে থেকে জড়ো হয়ে ওই কিশোরের গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ির দিকে স্লোগান দিতে দিতে আসে। এ সময় আমারসহ অন্তত ১৫টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধরনী কান্ত মোহন্ত, ধনঞ্জয় কুমার, অতুল চন্দ্র, কমলা কান্ত, দুলাল চন্দ্রের বাড়িঘর। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে।’
এ ঘটনার পর থেকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এলাকায় টহল দিচ্ছে। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা উত্তেজিত জনতার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে এলাকায় রয়েছে। আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য কাজ করছি।
সন্ধ্যায়ও গঙ্গাচড়ার খিলালগঞ্জ বাজারে উত্তেজিত জনতা স্লোগান দিতে দেখা গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছে।
খবরওয়ালা/আরডি