খবরওয়ালা মফস্বল ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে চৈত্র ১৪৩১ | ৩ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
পরিবারের ভাগ্য ফেরানোর আশায় বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার লোকমান হোসেন। কিন্তু স্বপ্নের দেশ হয়ে উঠল দুঃস্বপ্নের কারাগার। দালালদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ১১ মাস বন্দিজীবন কাটাতে হলো তাকে। মুক্তিপণের নামে হাতিয়ে নেওয়া হলো তার সর্বস্ব। অবশেষে চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, দেশে ফিরতে পারলেন তিনি। আর তাঁর এই অভিজ্ঞতার কথাগুলো তিনি গণমাধ্যমে তুলে ধরেন।
লোকমানের বিদেশযাত্রা শুরু হয়েছিল স্থানীয় দালাল শাহ আলমের মাধ্যমে, যার হাতে তিনি প্রথমে তুলে দেন সাড়ে তিন লাখ টাকা। পরিকল্পনা ছিল লিবিয়ায় গিয়ে ভালো একটা কাজ করার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, শাহ আলম তাকে আরও এক দালালের হাতে বিক্রি করে দেয়। পরে ইতালি যাওয়ার পথে তিনি মানব পাচারকারীদের কবলে পড়েন।
নতুন স্বপ্ন নিয়ে লোকমান ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতারক চক্রের হাতে পড়লে দুঃস্বপ্ন আরও ঘনীভূত হয়। হবিগঞ্জের দালাল শিরু ইসলামের কাছে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও তিনি ইতালি যেতে পারেননি। শেষ চেষ্টা হিসেবে মাদারীপুরের দাদন জমাদ্দারকে ১২ লাখ টাকা দেন। কিন্তু প্রতিবারই তার পরিণতি হয় বন্দিজীবন।
লিবিয়ার ত্রিপলির জহুরা ঘাট ওসামা ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায় লোকমানকে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়। খাবার না দেওয়া, শরীরে গরম ডিম ঢুকিয়ে দেওয়া, কান ধরে ‘মুরগি সাজিয়ে’ রাখা—এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। আরও নির্মম ছিল এক হাতে ভর দিয়ে উল্টো করে দাঁড় করিয়ে রাখা, রাতে পরিবারের কাছে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে মুক্তিপণ চাওয়ার চাপ সৃষ্টি করা।
বন্দিদশায় যখন মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তিনি এমনকি নিজের তিন সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। মানবিক বিপর্যয়ের এই চূড়ান্ত পরিণতি লোকমানের জীবনসংগ্রামের ভয়াবহ রূপ প্রকাশ করে।
লোকমানের স্ত্রী রিমি আক্তার দীর্ঘ ১১ মাস ধরে স্বামীর মুক্তির জন্য দিন গুনেছেন, দালালের বাড়িতে থেকেছেন, টাকা সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত লোকমান মুক্তি পেলেও, দালালদের হাতে তার সর্বস্ব লুট হয়ে গেছে। শুধু মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেশে ফিরতে পেরেছেন তিনি।
সাপলেজা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য কাজল খান জানান, লোকমান এখন চরম অসুস্থ। শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। তার এখন ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন।
লোকমান হোসেনের ঘটনা শুধু তার একার নয়, এটি আমাদের সমাজের সেই নির্মম বাস্তবতা যেখানে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ বিদেশে ভালো জীবনের স্বপ্ন নিয়ে প্রতারণার শিকার হন। তাদের জীবন হয়ে ওঠে বন্দিদশার এক ভয়ংকর অধ্যায়।
প্রশ্ন থেকে যায়—এভাবে আর কতজনের ভাগ্য বিপর্যস্ত হবে? আর কত পরিবার নিঃস্ব হবে দালালদের হাতে? মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
খবরওয়ালা/আরডি