খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫
রক্তের গ্রুপ এবং স্ট্রোকের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে—এটা হয়তো অনেকেরই অজানা। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, রক্তের গ্রুপের উপর ভিত্তি করেই স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে বা কমে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কিছু রক্তের গ্রুপে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে, আর কিছু গ্রুপে এটি তুলনামূলকভাবে কম।
প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং এই রোগের কারণে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যান। স্ট্রোক সাধারণত আকস্মিকভাবে ঘটে, অনেক সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিপদ ঘটে যায়। স্ট্রোক প্রতিরোধে বেশ কিছু গবেষণা চলমান রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় রক্তের গ্রুপের সাথে স্ট্রোকের সম্পর্ক উঠে এসেছে, যা স্ট্রোক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রক্তের গ্রুপের ভূমিকা
আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড স্কুল অফ মেডিসিনের গবেষকরা এক গবেষণায় জানিয়েছিলেন, রক্তের গ্রুপ ‘এ’ থাকলে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। আর গ্রুপ ‘ও’ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কম থাকে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ‘এ’ গ্রুপের রক্তধারীদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি ১৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, গ্রুপ ‘ও’ রক্তধারীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক কম।
তবে, বাকি দুই রক্তের গ্রুপ ‘এবি’ ও ‘বি’-এর ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকলেও তা ‘এ’ গ্রুপের মতো গুরুতর নয়। ‘এবি’ গ্রুপের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা স্মৃতিনাশের মতো রোগের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
স্ট্রোক কীভাবে ঘটে?
স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণে ঘটে। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়া, এবং অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীগুলোতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এতে রক্ত জমাট বাঁধে, ধমনীগুলো ব্লক হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে মস্তিষ্কের কোষ অকেজো হয়ে যায় এবং স্ট্রোক হয়। সাধারণত স্ট্রোকের দুই ধরন থাকে—ইস্কিমিক স্ট্রোক এবং হেমারেজিক স্ট্রোক।
* ইস্কিমিক স্ট্রোক: এই স্ট্রোকে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে রক্ত জমাট বেঁধে যায়।
* হেমারেজিক স্ট্রোক: এতে রক্তজালিকা স্ফীত হয়ে ছিঁড়ে যায় এবং মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
গবেষণা ফলাফল
মেরিল্যান্ডের গবেষক স্টিভেন জে কিটনার এবং তাঁর টিম জানিয়েছেন, ৬ লক্ষের বেশি মানুষের উপর প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর শরীর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যাঁদের রক্তের গ্রুপ ‘এ’ ছিল, তাঁদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি ১৬ শতাংশ বেশি। অপরদিকে, যাঁদের ‘ও’ গ্রুপের রক্ত ছিল, তাঁদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি ছিল অনেক কম।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর উপায়
স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে রক্তের গ্রুপ যাই হোক না কেন, কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদক্ষেপগুলো হলো-
* রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ।
* রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন: ডায়াবেটিসও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
* ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: শরীরের ওজন স্বাভাবিক রাখতে হবে।
* নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
* ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করুন: এই দুটি অভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
* স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করুন: পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং চর্বিযুক্ত ও উচ্চ শর্করাযুক্ত খাবার কমাতে হবে।
* পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: যদি আপনার পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস থাকে, তবে ৩০ বছর বয়স পার করার পরই রক্তচাপ, সুগার, এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরীক্ষা করিয়ে নিন।
টিআইএ বা মিনি স্ট্রোক
যদি আপনি হঠাৎ আপনার জিভ, হাত বা পা অসাড় হয়ে যেতে দেখেন, কথা বলতে না পারেন অথবা চোখে অন্ধকার দেখতে পান, তবে এটি হতে পারে একটি ট্র্যানজিয়েন্ট ইস্কিমিক অ্যাটাক (টিআইএ), যা ‘মিনি স্ট্রোক’ হিসেবে পরিচিত। এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর জন্য জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা এবং রক্তচাপ, শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আর বিশেষত, যদি আপনার রক্তের গ্রুপ ‘এ’ হয়, তবে এ বিষয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
সূত্র: আনন্দবাজার
খবরওয়ালা/আরডি