আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে সোমবার সকালে শুরু হওয়া আন্ডারগ্রাউন্ড টিউব ধর্মঘটে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দিনের শুরুতেই প্রধান পাতাল রুটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ বাধ্য হয়েছেন বিকল্প যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে।
স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৬টা থেকে ট্রেনচালক ও কর্মীদের ডাকা এই ধর্মঘট শুরু হয়। জানা গেছে, বেতন কাঠামো, কর্মঘণ্টা এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আলোচনায় কোনো সমাধান না হওয়ায় শ্রমিক সংগঠন এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
ধর্মঘটের কারণে সকালে অফিসগামী যাত্রীদের ভিড়ে শহরের সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বাস ও ট্যাক্সিতে ঠাসাঠাসি করে যাত্রীদের যাতায়াত করতে দেখা যায়। অনেকেই সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি।
যাত্রীদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি প্রবাসী আরিফ হোসেন বলেন, “আজ অফিসে পৌঁছাতে স্বাভাবিক সময়ের তিনগুণ বেশি সময় লেগেছে। এমন পরিস্থিতিতে কাজ করা ভীষণ কঠিন।”
অন্যদিকে, লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তারা যাত্রীদের ভোগান্তি বুঝতে পারছেন, তবে শ্রমিকদের দাবিগুলো সমাধানের জন্য আলোচনা এখনো চলছে। শ্রমিক সংগঠন ইঙ্গিত দিয়েছে যে সমঝোতা না হলে ধর্মঘট আরও কয়েক দিন চলতে পারে।
লন্ডনের টিউব বা আন্ডারগ্রাউন্ড প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। এতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে গোটা নগরীর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ধর্মঘট আহ্বানকারী শ্রমিক সংগঠন আরএমটি তাদের ১০,৪০০ টিউব সদস্যকে রবিবার থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক ধর্মঘটে অংশ নিতে বলেছে, যা শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পরিষেবা ব্যাহত করতে পারে। সংগঠনটির দাবি, লন্ডনের মেয়রকে অবশ্যই চার দিনের কর্ম সপ্তাহ ও ৩২ ঘণ্টার কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে।
লন্ডনের মেয়র সাদেক খান গত বছরের জানুয়ারিতে ডাকা ধর্মঘট ঠেকাতে সিটি হলের তহবিল থেকে টিউব কর্মীদের অতিরিক্ত বেতন বাড়ানোর জন্য ৩ কোটি পাউন্ড দিয়েছিলেন।
তবে সোমবার বিকেলে লন্ডনের স্থানীয় গণমাধ্যমকে তিনি জানান, গত বছরের সেই উদ্যোগ ছিল ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির’ কারণে এবং এবার তিনি তা করতে ‘অক্ষম’।
তিনি দ্য ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আরএমটি এবং টিএফএল-এর একসাথে বসে তাদের মতবিরোধ নিয়ে আলোচনা করা এবং যতটুকু সম্ভব সমাধানের পথ বের করা। আমি ঢোল পিটিয়ে বলতে চাই না যে এই ধর্মঘটগুলো আমাদের শহরের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর।”
তিনি আরও বলেন, “এগুলো হাসপাতালে রোগীর অ্যাপয়েন্টমেন্টে যেতে সমস্যা তৈরি করছে, অভিভাবকদের জন্য সন্তানদের স্কুলে পৌঁছানো কঠিন করে তুলছে এবং যারা বাড়ি থেকে কাজ করতে পারেন না, তাদের জন্য তো আরও কষ্টকর।”
মেয়র উল্লেখ করেন, অতীতে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে—যেমন রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি বা লিজ ট্রাসের ‘মিনি বাজেট’—তিনি মেট পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড এবং টিএফএলকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। তবে এখন সেটি আর সম্ভব নয়।
ধর্মঘটের মধ্যেও শত শত লন্ডনবাসী শুধু এলিজাবেথ লাইন, বাস ও সাইকেল ব্যবহার করে সেন্ট্রাল লন্ডনের কর্মস্থলে পৌঁছান। তবে কিছু ছোট ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন যে ইউনিয়ন লন্ডনকে ‘জিম্মি’ করে রেখেছে।
ভাড়াভিত্তিক বাইক কোম্পানি লাইম জানিয়েছে, তাদের ই-বাইকের চাহিদা ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। মেয়র সাদিক খান টিএফএল বোর্ডের চেয়ারম্যানও। গত বছরের তার হস্তক্ষেপের কারণে এবার টিএফএল-এর পক্ষে আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কারণ, আরএমটি আলোচকরা মনে করেন টিএফএল-এর ‘চূড়ান্ত প্রস্তাবে’ ৩.৪ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে কিন্তু সাপ্তাহিক ৩৫ ঘণ্টার কর্মঘণ্টা কমানো হয়নি।
তারা বিশ্বাস করেন যে টিএফএল-এর ওপর চাপ বাড়িয়ে—আরও ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে—অন্তত আধা ঘণ্টা হলেও কর্মঘণ্টা কমানোর সুযোগ তৈরি করা যাবে।
আরএমটি মূলত টিএফএল-এর কাছ থেকে এমন দাবি আদায়ের জন্য এই ধর্মঘট করছে, যা দীর্ঘদিন ধরে টিউব স্টেশন কর্মীদের শিফট প্যাটার্ন ও কাজের চাপ সংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গে জড়িত।
বাস্তবতা হলো, একদিকে কাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণ করতে মেয়র অপারগতা প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা টিএফএল কর্তৃপক্ষকে তা মানতে বাধ্য করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন। এই দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে লন্ডনের সাধারণ মানুষের অবস্থা নাজেহাল।
খবরওয়ালা/টিএসএন