খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বৈশ্বিক বাজারে ‘বিওয়াইডি সিল’ একটি অত্যন্ত সুপরিচিত ও জনপ্রিয় নাম। আন্তর্জাতিক বাজারের এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের বাজারেও সিল মডেলের বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ি দিয়ে নিজেদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছিল বিওয়াইডি। তবে পূর্ববর্তী মডেলগুলোর বাজারমূল্য কোটি টাকার কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের নাগালের মধ্যে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে এবার তুলনামূলক কম দামে ‘বিওয়াইডি সিল ৬’ মডেলের নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি দেশের বাজারে নিয়ে আসছে বিওয়াইডি বাংলাদেশ।
নতুন এই সেডান মডেলের গাড়িটি একবার পূর্ণ চার্জে সর্বোচ্চ ৪১০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। এর পাশাপাশি মাত্র ৩০ মিনিটে গাড়িটি সম্পূর্ণ চার্জ করা সম্ভব। সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত বিওয়াইডি প্রদর্শনী কেন্দ্র থেকে শুরু করে এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ৩০০ ফুট রাস্তার পূর্বাচল ক্লাব পর্যন্ত এই গাড়িটির বাস্তবমুখী পারফরম্যান্স ও কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য একটি বিস্তারিত টেস্ট ড্রাইভ সম্পন্ন করা হয়।
বিওয়াইডি সিল ৬ গাড়িটির সম্মুখভাগে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত বনেটের নকশা, যা চালককে আসন থেকে সামনের রাস্তার সঠিক পরিমাপ নিতে সহায়তা করে। গাড়ির দুই পাশে আধুনিক এলইডি হেডলাইট এবং বাম্পারের অভ্যন্তরে বাতাস চলাচলের জন্য দুটি সরু ফাঁকা স্থান রাখা হয়েছে, যা দূর থেকে ফগলাইট হাউজিংয়ের মতো দেখায়। নম্বর প্লেটের নিচে একটি বৃহৎ আকৃতির এয়ার ইনটেক্ট সিস্টেম বা বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে এবং এর ঠিক মাঝখানে শোভা পাচ্ছে বিওয়াইডির লোগো। সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে নির্মিত হওয়ায় প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ইঞ্জিনের স্থানে (বনেটের নিচে) ৬৫ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অতিরিক্ত মালামাল রাখার জায়গা বা বুট স্পেস পাওয়া যাবে। এর ফলে গাড়িটির সামনে এবং পেছনে—উভয় দিকেই মালামাল পরিবহনের সুবিধা রয়েছে। গাড়িটির পেছনের অংশজুড়ে একটি নান্দনিক এলইডি ব্যাকলাইট, নিচে বিওয়াইডির লোগো, ডান পাশে মডেলের নাম এবং বাম পাশে ইভি (EV) লোগো যুক্ত করা হয়েছে। এর একদম নিচের অংশে দুই পাশে রিফ্লেক্টর এবং মাঝখানে নম্বর প্লেট বসানোর জায়গা রয়েছে।
গাড়িটির অভ্যন্তরে চালক ও যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক চামড়ায় মোড়ানো আসন রয়েছে। চালক ও প্রথম সারির যাত্রীর আসন দুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পেছনের সারিতে পর্যাপ্ত লেগ রুম ও হেড রুম থাকার পাশাপাশি কোনো ড্রাইভ ট্রেইন বা উঁচু অংশ না থাকায় মাঝখানের যাত্রীও স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারেন।
তথ্য ও বিনোদনের জন্য চালকের সামনে ৮.৮ ইঞ্চির একটি ডিজিটাল ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লাস্টার এবং মাঝখানে ১২.৮ ইঞ্চির একটি প্রশস্ত মাল্টিমিডিয়া ডিসপ্লে রয়েছে। চালকের সামনের ডিসপ্লেতে গাড়ির গতিবেগ, ব্যাটারির ব্যবহার, অবশিষ্ট চার্জের পরিমাণ এবং বর্তমান চার্জে গাড়িটি আর কত কিলোমিটার চলতে পারবে তা রিয়েল-টাইমে প্রদর্শিত হয়। এই মাল্টিমিডিয়া ডিসপ্লেটি অ্যাপল কার প্লে এবং অ্যান্ড্রয়েড অটোর মাধ্যমে স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত করা যায়। ডিসপ্লের পেছনের পুরো অংশে একটি উজ্জ্বল কালো রঙের প্লাস্টিক প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে।
যাত্রীদের সুবিধার্থে গাড়ির ভেতরে রয়েছে ২.৫ পিএম (PM 2.5) বায়ু বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তিসম্পন্ন শক্তিশালী শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। স্টিয়ারিং হুইলটি প্রয়োজনানুযায়ী সামনে-পেছনে এবং ওপর-নিচ করে সামঞ্জস্য (অ্যাডজাস্ট) করা সম্ভব, যাতে ক্রুজ কন্ট্রোল ও মাল্টিমিডিয়া নিয়ন্ত্রণের বাটন যুক্ত রয়েছে। চালকের বাম পাশে স্টার্ট বাটনের পাশাপাশি দুটি মোবাইল ফোন রাখার জায়গা, প্রয়োজনীয় কিছু বাটন এবং দুটি গ্লাস হোল্ডার রয়েছে। এছাড়া স্মার্টফোন দ্রুত চার্জ করার জন্য সামনে ও পেছনের উভয় সারিতেই ইউএসবি (USB) এবং টাইপ সি (Type-C) ফাস্ট চার্জিং পোর্ট দেওয়া হয়েছে।
টেস্ট ড্রাইভের সময় ৫ জন যাত্রীসহ গাড়িটিকে সর্বোচ্চ ১৩৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে চালানো হয়। গাড়িটি স্থির অবস্থা থেকে মাত্র ১২.৭ সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগ অর্জন করতে পারে। এতে সাধারণ (নরমাল) মোড ছাড়াও ইকো (Eco), স্পোর্টস (Sports) এবং স্নো (Snow)—এই তিনটি ড্রাইভিং মোড রয়েছে, যার মধ্যে ইকো মোডে সর্বোচ্চ মাইলেজ পাওয়া যায়।
বৈদ্যুতিক যান হওয়ায় এটি তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ ২২০ নিউটন মিটার টর্ক উৎপন্ন করতে পারে, যেখানে কোনো টর্ক লস বা শক্তির অপচয় হয় না। গাড়িটির সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ৯৫ কিলোওয়াট, যা প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ১২৮ হর্সপাওয়ার বা অশ্বশক্তির সমতুল্য। এটি মূলত একটি রিয়ার-হুইল ড্রাইভ বা পেছনের চাকার শক্তিতে চলা গাড়ি। বিওয়াইডি সিল ৬ মডেলে ৪৬.০৮ কিলোওয়াট-আওয়ার ক্ষমতার বিওয়াইডি ব্লেড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। গাড়িটিতে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং সিস্টেম থাকার কারণে ব্রেক করার সময় চাকার ঘূর্ণনশক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাটারি চার্জে রূপান্তরিত হয়।
গাড়িটির সামগ্রিক পরিমাপ, চাকা, সাসপেনশন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাবতীয় কারিগরি তথ্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বৈশিষ্ট্য / পার্টস | নির্দিষ্ট পরিমাপ ও বিবরণ |
| দৈর্ঘ্য | ৪,৭২০ মিলিমিটার |
| প্রস্থ | ১,৮৬০ মিলিমিটার |
| উচ্চতা | ১,৪৯৫ মিলিমিটার |
| গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স (ভূমি থেকে উচ্চতা) | ১,৬১০ মিলিমিটার |
| হুইলবেস (চাকার পরিধি) | ২,৮২০ মিলিমিটার |
| গাড়ির ওজন | ১,৬৭০ কেজি |
| পেছনের বুট স্পেস (প্রধান মালামাল রাখার জায়গা) | ৪৬০ লিটার |
| সামনের বুট স্পেস (বনেটের নিচে) | ৬৫ লিটার |
| টায়ারের আকার | ২২৫/৫৫ আর ১৭ (225/55 R17) |
| সামনের সাসপেনশন | ম্যাকপার্সন স্টার্ট (MacPherson Strut) |
| পেছনের সাসপেনশন | মাল্টি-লিংক সাসপেনশন (Multi-link) |
| ব্রেকিং সিস্টেম | চার চাকাতেই ডিস্ক ব্রেক |
| নিরাপত্তা সুবিধা | ৬টি এয়ারব্যাগ এবং স্বচ্ছ ব্যাক ক্যামেরা |
| অডিও সিস্টেম | ৬টি স্পিকার |
বিওয়াইডি সিল ৬ গাড়িটিতে দুই ধরনের চার্জিং পোর্ট রয়েছে। ৮০ কিলোওয়াট-আওয়ার ক্ষমতার সিসিএস ২ (CCS 2) ফাস্ট চার্জারের মাধ্যমে মাত্র ৩০ মিনিটে গাড়িটি সম্পূর্ণ চার্জ করা সম্ভব। অন্যদিকে, ৭ কিলোওয়াট-আওয়ার ক্ষমতার সাধারণ হোম চার্জার ব্যবহার করলে গাড়িটি পূর্ণ চার্জ হতে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় নেয়। টেস্ট ড্রাইভে দেখা যায়, স্বাভাবিক গতিতে চালানোর সময় ৬৭ শতাংশ চার্জ থেকে পূর্বাচল পৌঁছানো পর্যন্ত মাত্র ১ শতাংশ চার্জ খরচ হয়। তবে ঘন ঘন থ্রটল এবং ব্রেক ব্যবহারের কারণে ফিরতি পথে চার্জের পরিমাণ ৬৭ শতাংশ থেকে কমে ৩২ শতাংশে নেমে আসে।
গাড়িটির কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে—এতে কোনো সানরুফ ও তারবিহীন (ওয়ারলেস) চার্জিং সুবিধা নেই। গাড়িটির গিয়ার লিভারটি প্রচলিত সংকেত প্রদানকারী (ইন্ডিকেটর) লিভারের স্থানে অবস্থিত হওয়ায় চালকদের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে। এছাড়া লুকিং গ্লাসে রিয়ার ব্লাইন্ড স্পট মনিটরিং সিস্টেম ও ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা অনুপস্থিত। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার জন্য এতে পৃথক কোনো ফগলাইট দেওয়া হয়নি।
বিওয়াইডি বাংলাদেশের পণ্য উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী নাকিবুল ইসলামের তথ্যমতে, শহরে দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য এই গাড়িটিতে সপ্তাহে মাত্র একবার চার্জ দেওয়াই যথেষ্ট। সেডান ক্যাটাগরিতে এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব একটি বিকল্প।
বিওয়াইডি বাংলাদেশ এই গাড়িটির সাথে ৬ বছর বা ১ লক্ষ ৫০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত (যেটি আগে পূর্ণ হবে) অফিশিয়াল বিক্রয়োত্তর সেবা (ওয়ারেন্টি) প্রদান করবে। এর পাশাপাশি গাড়িটি কেনার পর গ্রাহকদের বাসায় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে একটি হোম চার্জার স্থাপন করে দেওয়া হবে এবং যেকোনো স্থানে চার্জ দেওয়ার সুবিধার্থে গাড়ির সাথে আরও একটি বহনযোগ্য (পোর্টেবল) চার্জার সরবরাহ করা হবে। বাংলাদেশের বাজারে বিওয়াইডি সিল ৬ মডেলটির সম্ভাব্য মূল্য ৫০ লক্ষ টাকার মধ্যে থাকবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।