খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নানামুখী জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং সম্প্রতি অর্জিত একটি সমঝোতাকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন এলাকায় এই উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রথম বৈঠকটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বৈঠকের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। এই বিশেষ সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও সরাসরি অংশগ্রহণ করছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা এএফপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মূলত সেই সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবং তা বাস্তবায়নের পথ সুগম করতেই সুইজারল্যান্ডে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। তবে বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতেই দুই দেশের মধ্যকার বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের জটিল ইস্যু সামনে চলে এসেছে, যা নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট চার দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল বর্তমানে লেক লুসার্নের একটি সুরক্ষিত রিসোর্টে অবস্থান করছেন এবং সেখানেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই রুদ্ধদ্বার আলোচনা ও পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলের মূল নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে, ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এই দুই বৈরি দেশের মধ্যে সফল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তানের বিশেষ প্রতিনিধিরাও এই আন্তর্জাতিক আলোচনা টেবিলটিতে উপস্থিত থেকে সার্বিক দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।
বৈঠকের প্রাথমিক আলোচ্যসূচিতে বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ আর্থিক সম্পদ ও রিজার্ভ অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজতর করা। ইরানি প্রতিনিধিদলে স্পিকার গালিবাফ ছাড়াও দেশটির উপতেলমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সশরীরে উপস্থিত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নিজেদের আটকে থাকা জাতীয় আর্থিক সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টিকে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে তেহরান।
তবে এই আলোচনা শুরু হলেও বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার আগের সিদ্ধান্ত থেকে এখনই সরে আসেনি ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দাবি করা হয়েছে যে, লেবাননে চলমান সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। লেবানন সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার এই কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে এবং ইরান এই বিষয়টিকে বর্তমান সামগ্রিক আলোচনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে, চলমান পরিস্থিতির কারণে মূল এজেন্ডার বাইরেও আলোচনায় লেবানন সংকট ও সেখানে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়টি অন্যতম গুরুত্ব পেয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক থেকে শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কোনো স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা বেরিয়ে আসে কি না, সেদিকেই এখন নিবিড়ভাবে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল ও বিশ্ব গণমাধ্যম।