নিলয় সুন্দরম
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
‘আমি একটা কুত্তার বাচ্চা’—মাইক্রোফোনে কথাটা বলতেই পুরো জনসভায় একটা বাজ পড়ে অথবা আকাশভাঙা শব্দে একটা বোমা বিস্ফোরিত হয়। অন্যভাবে বললে বলা যায়, একটা বোমারু বিমান, বোমা না ফেলে জনসভার ভরা মজলিশে কথাটা ফেলে চলে যায়। কথাটা যেভাবেই বলা হোক অথবা ফেলা হোক, উপস্থিত লোকজনের ওপর তা ঠিক বোমা বা বজ্রপাতের মতোই ক্রিয়া করে। কিন্তু লোকজন ক্রিয়ার বিপরীতে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে যায়। তারা কথা বলতে ভুলে যায়। তারা নড়াচড়া করতে ভুলে যায়। একজন আরেকজনের মুখ-দেখাদেখি ছাড়া কোনো ইশারা-ইঙ্গিত করতেও ভুলে যায়। এই মুখ-দেখাদেখিতে সবাই একজন আরেকজনের চোখেমুখে কতগুলো যতিচিহ্ন ভেসে উঠতে দেখে। তবে সেখানে বিস্ময় ও প্রশ্নবোধক চিহ্ন দুটির আধিক্যই বেশি থাকে বলে তারা মনে করে। কিন্তু কোথাও তারা কেউ কোনো উত্তর দেখতে পায় না। ‘ও এটা কী বলল! ও এমন কথা কেন বলল? একটা মানুষ কেমনে কুত্তার বাচ্চা হয়! নিজেকে নিজে কেন কুত্তার বাচ্চা বলল? এমন খুশির দিনে নিজেকে নিজে কেন এমন একটা গালি দিল?’—এমন হাজারও প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা জড়িত অবাক-বিস্মিত মুখ তারা দেখে বা দেখতে পায়।
এমন সব মুখের ভিড়ে প্রতিটি মুখ ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়লে তারা একজন আরেকজনের চোখেমুখে আতঙ্কও ভেসে উঠতে দেখে। কারণ, এই একটা কথা শোনার পর থেকে তারা কেউ আর কোনো কিছুই শুনতে পায় না, কেউ কিছুই বলতে পারে না। তাদের প্রত্যেকের মনে হয়, তারা বোবা হয়ে গেছে এবং কথাটার বা বোমাটার অথবা কথা-বোমাটার শব্দে কানে তালা লেগে তারা সবাই কালা হয়ে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, কোথাও কোনো কথা নেই। একটা অলৌকিক নীরবতা তাদের মুখর পৃথিবীকে এককথায় গ্রাস করে ফেলেছে। তারা সবাই একটা শামিয়ানার নিচে সমবেত। হরেক রকম বাহারি রঙের শামিয়ানা পার হয়ে আসতে গিয়ে পশ্চিমে হেলে পড়া দিনের আলো বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। নানা রঙের ঝলকানিতে উপস্থিত মুখগুলোও দেখাচ্ছে বহু রকম, বহুরূপী। মঞ্চে উপবিষ্ট গণ্যমান্যদের অবস্থাও তাই। মঞ্চের রকমারি সজ্জায় তাদের রূপভেদ একটু বেশি বলেই মনে হয়।
সে মঞ্চের এক কোনায় আটাশ-ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবক একটা জাদুদণ্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই জাদুদণ্ডেই সে তাদের সবাইকে বিবশ করে ফেলেছে। যুবকটি তাদের খুব পরিচিত কিন্তু এখন যেন তাকে আর চেনা যাচ্ছে না। তারা যাকে চিনত, মতিউর রহমান নামের যাকে তারা সকলে আদর করে এত দিন মতি বলে ডাকত, এ যেন সেই ছেলে নয়। যে মতি বড় কী একটা পরীক্ষায় পাস দিয়ে সরকারি বড় চাকরি পেয়ে তাদের গলায় মোতির মালা হয়ে এসেছে বলে তারা মনে করছিল, এ যেন তাদের সেই মতি নয়। ‘সে নিজেরে এইটা কেমন কথা কইল! নিজেরে নিজে এমন বাপ-মা তুইল্লা গালাগাল দেয়! নিজের বাপ-মারে এত এত মানুষের সামনে এমন বেইজ্জতি করে! এই তার বড় পাসের নমুনা! এই তার এত দিনের শিক্ষাদীক্ষা! তার জন্য আইজ এই অনুষ্ঠান, এত আয়োজন! গেলবার বাপটা মারা যাওনের আগপর্যন্ত এই পোলার জন্য কত কষ্ট করছে। ‘রিকশা চালাই মাথার ঘাম পায়ে ফালাই’ তারে লেখাপড়া করাইছে। তার মা মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজকাম কইরা সংসার চালাইছে। একমাত্র পোলা বলে কোনো কাজকাম করতে দেয় নাই, কোনো কিচ্ছুর অভাব বুঝবার দেয় নাই। আর আজ সেই পোলার মুখে এই কথা!’ কথাগুলো উপস্থিত সকলের ভেতরে-ভেতরে, মাথায় মাথায় ঘুরপাক খায়। ভাসে, ডুবে, তড়পায়।
তাদের সকলের আদরের মতি তখনো চুপ করে থাকে। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এসে মাথার ওপরের শামিয়ানায় ঢেউ খেলে যায়। বহুরূপী মুখগুলো কেঁপে কেঁপে ওঠে, দোল খায়। গরম গুমট নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশে এক পলকা বাতাস ঠান্ডা পরশ বুলিয়ে যায় এবং তাতে শামিয়ানার পেছনের দিকে সমবেতদের মধ্য থেকে কোনো একজনের ঘোর কেটে যায়। তার মনে-মাথায় ঘুরপাক খাওয়া, ভেসে-ডুবে-তড়পানো দু-একটা কথা সে নিজে নিজেই অস্ফুটে উচ্চারণ করে ফেলে। তারপর সে কথা আরেকজনকে ধাক্কা দিলে তারও ঘোর কেটে যায়। সে-ও কী কী যেন বলে ফেলে। এভাবে একজন একজন করে অনেকজন অনেক কথা বলতে শুরু করলে সমাবেশজুড়ে একটা শোরগোল ওঠে। শোরগোলের ঢেউ ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এবং খুব অল্প সময়ে তা মঞ্চে গিয়ে আছড়ে পড়ে।
মঞ্চে উপবিষ্ট গণ্যমান্য কোনো একজনের ঘোর কাটে। তিনি কিছু না বলে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং ধীরপায়ে মঞ্চের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা মতিউর রহমান উরফে মতির কাঁধে হাত রাখেন। কানে কানে কী যেন বলে নিজের আসনে ফিরে যেতে থাকেন। মতি নড়েচড়ে ওঠে। তার হাতে থাকা মাইক্রোফোনটি সে মুখের কাছে নিয়ে গলায় আটকে থাকা কিছু বাতাস অথবা দীর্ঘশ্বাস ফুঁ দিয়ে বের করে দেয়। সে ফুঁ বৈদ্যুতিক তার বেয়ে যান্ত্রিক ফুৎকার হয়ে ওঠে। ঘোর কেটে যাওয়া উপস্থিত সকলে এবার এক ফুৎকারে একযোগে মঞ্চের দিকে চোখ-কান ফিরিয়ে দেয়। মতি আবার কথা বলে, ‘আমি একটা কুত্তার বাচ্চা। কথাটা আপনাদের কাছে একটা গালি মনে হইতে পারে কিন্তু এইটা আমার কাছে কোনো গালি না। এইটা আমার পরিচয়। আমার একজীবনের আত্মপরিচয়। ছোটবেলায় এই কথাটা শুনতে শুনতে আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন আমিও কথাটা গালি হিসেবেই নিতাম। গালি হিসেবেই শুনতাম, জানতাম আর রাগ করতাম। কোনো কোনো সময় কান্নাকাটিও করতাম। যা-ই হোক, আমি নিজের সেই পরিচয় দেওয়ার আগে আজকে যারা আমার জন্য এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন এবং আপনারা যারা এইখানে উপস্থিত হইছেন, সবাইরে আমার সালাম জানাই। আন্তরিক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা জানাই। আর আজকের এই দিনে আমি শোক ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি আপানাদের দশজনের চেনাজানা অতি সাধারণ একজন হেলু মিয়াকে। একজন অতিদরিদ্র রিকশাচালক, আপনারা যার রিকশায় চড়তেন, আর ছেলে হিসেবে আমি যার কাঁধে চড়তাম অথবা সারা জীবনই চড়ে ছিলাম, আমার আব্বা মোহাম্মদ হেলু মিয়াকে। যিনি আমার জীবনে আছিলেন চোখে দেখতে পাওয়া একজন ফেরেশতা। সাধারণের মধ্যে মিশে থাকা একজন অসাধারণ মূর্ত দেবতা। মানুষের বেশে থাকা একজন মহামানব। যার জন্য আমি আজ এইখানে আপনাদের সামনে দাঁড়াই আছি। জি, আমার আব্বা মোহাম্মদ হেলু মিয়া, একজন অতিদরিদ্র রিকশাচালক হইলেও একজন অসামান্য ভালো মানুষ আছিলেন। উনি আমাদের ছেড়ে গত হইছেন এক বছর দুই মাস বাইশ দিন। আজ তিনি থাকলে নিশ্চয়ই অনেক বেশি খুশি হইতেন।’
একটানা কথাগুলো বলে থামে মতি। উপস্থিত লোকজন বুঝতে পারে কথাগুলো বলতে গিয়ে শেষের দিকে মতির গলা ধরে এসেছিল। কণ্ঠ ভিজে গিয়ে দু-একটা কথা জড়িয়ে গিয়েছিল। লোকজন তাদের পরিচিত মতির চোখের দিকে চোখ রাখলে দেখতে পায়, মঞ্চে এসে লাগা বেলা শেষের সোনালি আলোয় মতির চোখের কোণে জলের কণা চিকচিক করে ওঠে। মতি হাতের আঙুলে সেই চিকচিকে জল মুছে নেয়। লোকজনের মনে হয় তাদের পরিচিত মতি এই অল্প কদিনে একঝটকায় অনেকখানি বড় হয়ে গেছে। সে আঙুলের ডগায় বুকের সমুদ্রকে থামিয়ে দিতে শিখে গেছে। হাজারজনের সামনে শিরদাঁড়া সোজা ও শক্ত রেখে কথা বলতে শিখে গেছে। কিন্তু তারা হয়তো বোঝে না অথবা তারা হয়তো ভুলে যায়, আটাশ-ত্রিশ বছরের যে যুবক হাজার লোকের সমাবেশে ‘আমি একটা কুত্তার বাচ্চা’ বলে নিজেকে পরিচয় দেয়, তার বুকে সমুদ্র থাকে না, থাকে বালিময় শুকনো মরুভূমি। মেরুদণ্ডে হাড়ের বদলে থাকে পাথর অথবা ইস্পাত। বুক উপচে চোখের কোণে দু-একটা বালিকণা চলে এলেও জল জমতে পারে না। জমার আগেই সে জল জলীয় বাষ্প হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তবে লোকজন জানতে চায়। তারা বুঝতে চায়। মতি কেন মোহাম্মদ হেলু মিয়াকে বাপ বলে ডেকে এত ভক্তি-শ্রদ্ধা করেও নিজেকে কুত্তার বাচ্চা বলল, তারা তা শুনতে চায়। এই কথার আসল রহস্য কী! তারা সে নিগম তত্ত্ব বা তথ্যের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। মতির কথার দীর্ঘ বিরতিতে তারা উসখুস করতে শুরু করে।
মতি লোকজনের উসখুস টের পেয়ে সচেতন হয়। তাড়াতাড়ি হাতের বোতলটা জায়গামতো রেখে, মুখে নেওয়া পানিটুকু গিলে আবারও বলতে শুরু করে, ‘আমার আম্মাকেও আপনারা কমবেশি সবাই চিনেন। আমারে লেখাপড়া করাতে গিয়া আশপাশের অনেকের বাড়িতেই কাজকাম করছে। নিজের শখ-আহ্লাদ, সুখ-শান্তি-আনন্দ বিসর্জন দিয়া আমারে পড়াশোনা করাইছে। এই মানুষটার জন্য আমি যেই কথাই বলি না কেন, কম হয়ে যাবে। ওনাকে তুলনা করে প্রশংসা করার মতো এবং কৃতজ্ঞতা জানানোর মতো কোনো ভাষা আমার জানা নাই। আজ আম্মার শরীরটা অনেক খারাপ, তাই এখানে আসতে পারেন নাই। আপনারা আমার আম্মার সুস্থতার জন্য দোয়া কইরেন।’
এটুকু বলে আরেকবার থামে মতি। সামনে থাকা মুখগুলোর দিকে তাকায়। শামিয়ানার হরেক রঙে সবার মুখের আদল কেমন কেমন ঠেকে তার কাছে। বুকের ভেতর একটা গুমট ব্যথা ছলকে ছলকে ওঠে। গলা বেয়ে বের হতে চায়। কিন্তু ব্যথার পাশাপাশি জ্বলতে থাকা একটা আগুন তার সবকিছুকে ধারালো করে রাখে, শান্ত ও কঠিন করে রাখে। অথবা তাকে উপলক্ষ করে এই আয়োজন-সমাগম তাকে কেমন একটা ঘোরগ্রস্ত করে রাখে। সেই ঘোরলাগা চোখে সে সামনের চকচকে চোখগুলোতে তার কথা শোনার আগ্রহ দেখতে পায়, অস্থিরতা টের পায়। সেসব তাকে কথা বলতে প্রেরণা জোগায় এবং সে বলে, ‘আপনারা আমার মুখ থেকে কী কথা শুনতে চান, আমার জানা নাই। আমি সুন্দর করে গুছিয়ে কথাও বলতে পারি না। তবে শুনতে চাইলে আমি একটা কুত্তার বাচ্চা কেমনে হইলাম, সেই কথাটুকু আপনাদের বলতে চাই।’
‘অবশ্যই শুনতে চাই। বলো, বলো…’ বলে মঞ্চ থেকে শুরু করে সামনের জমায়েতের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সমস্বরে চিৎকার ওঠে।
‘আমরা যখন ঢাকায় থাকতাম, তখন আমাদের সাথে থাকত হুম্যান। আমি ছোটবেলা থেকেই হুম্যানরে দেখছি এবং তার সাথেই খেলাধুলা করছি। সে সব সময় আমার কাছাকাছি থাকত, আমারে চোখে চোখে রাখত। মনে হইত যেন আমারে পাহারা দিতেছে। আব্বা-আম্মা আমাকে যেমন আদর করত, তেমনি হুম্যানরেও আদর-যত্ন করত। আমাদের বস্তিঘরের সামনে আব্বা তার একটা থাকার জায়গা করে দিছিল। আব্বার কথামতো হুম্যান নামটা দিছিল কোনো এক পত্রিকার সাংবাদিক। বড় হয়ে বুঝতে পারছি, সাংবাদিক সাব হয়তো নাম দিছিল হিউম্যান কিন্তু আব্বার শোনার ভুলে অথবা উচ্চারণদোষে হিউম্যান হয়ে গেছে হুম্যান। সে যা-ই হোক, আমরা তারে হুম্যানই ডাকতাম।
‘আমার ছয়-সাত বছর বয়সে একদিন আব্বা আমারে একটা স্কুলে ভর্তি করাই দেন। আমাদের বস্তির কাছেই পথশিশুদের জন্য খুলছিল স্কুলটা। প্রথম কয়েক মাস ভালোই চলছিল। নির্মল স্যারসহ আরও কয়েকজন স্যার-ম্যাডাম আমাদের লেখাপড়ার পাশাপাশি নাচ, গান আর ছবি আঁকা শিখাইতেন। অনেক মজা হইত। সে জন্য প্রতিদিন স্কুলেও যাইতাম। হুম্যান আমার সাথে সাথে স্কুলে যাইত। দূরে বসে বসে আমার খেয়াল রাখত, তীক্ষ্ণ চোখে আমার ওপর নজর রাখত। হুম্যান সাথে যাইত বলে আব্বা-আম্মাও নিশ্চিন্তে থাকত। পরে আমার দেখাদেখি আমাদের আশপাশের আরও কয়েকটা ছেলেমেয়েও ওই স্কুলে ভর্তি হয়। বস্তির মতো স্কুলেও ওরা আমারে প্রায়ই ‘কুত্তার ছাও’ বা ‘কুত্তার বাচ্চা’ বলে খ্যাপাইত, গালি দিত। আমিও তখন না বুঝে খেপতাম, রাগ করতাম। ঝগড়াঝাঁটি করতাম, মারামারি করতাম। তবে যত দূর মনে আছে, রাগে-দুঃখে-আক্রোশে কান্নাকাটিই করতাম বেশি। একদিন শেষমেশ রাগ করে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দেই। কয়েক দিন পর হঠাৎ সকাল সকাল আমাদের ঘরের সামনে নির্মল স্যার এসে হাজির হন। আব্বা ঘর থেকে বের হয়ে স্যারকে নিয়া ঘরের বাইরে মোড়া পেতে বসেন। আমি ঘরের ভিতর থেকে বিছানায় বসে বসে তাদের কথাবার্তা শুনি। বেড়ার ফাঁক দিয়া উঁকি মেরে দেখি।’
বেলা শেষ হয়ে আসে, সূর্যের গা থেকে সোনালি রং মুছে যায়। তখনো কথায় পাওয়া কথকের মতো মতি কথা বলতে থাকে। স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে তুলে আনতে থাকে পুরোনো অতীত। ঢাকায় ফেলে আসা তার ছোটবেলা, স্কুল, শৈশব। যেন হৃদয় খুঁড়ে বের করে আনে এক অতলান্তিক বেদনা। সামনে বসে থাকা শ্রোতারাও মুগ্ধ হয়ে সেসব গল্প-কথায় ডুবে থাকে। কিন্তু তাদের মনে বিবিধ প্রশ্ন এসে উঁকি-ঝুঁকি দেয়। এই হুম্যান বা হিউম্যানটা কে? হেলু মিয়ার আগের সংসারের কোনো পোলা নাকি? নামটাই-বা এমন ক্যান? ইত্যাকার নানান প্রশ্ন নিয়ে এবং সেসবের মীমাংসা শোনার আগ্রহ নিয়ে মতির কথা শুনতে থাকে শ্রোতারা।
‘মতি কেন স্কুলে যাচ্ছে না, হেলু ভাই?’ নির্মল স্যারের প্রশ্নে আব্বা উত্তর দিছিল, ‘ওরে আর এইখানের স্কুলে পড়াইতাম না, স্যার। সামনের বছর গ্রামে চইলা যামু। গ্রামেই ওরে যতটুকু পারি পড়ালেখা করামু। এইখানে পোলাপাইন ওরে কুত্তার বাচ্চা বইলা খেপায়, জ্বালাতন করে। কোথাও কোনো শান্তি পায় না পোলাটা। এর আগেও দুইটা স্কুল ছাড়তে হইছে।’ নির্মল স্যার আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘ওরে কুত্তার বাচ্চা বলে খেপায়, নাকি গালাগাল দেয়?’ আব্বা মলিন মুখে উত্তর দেন, ‘মাঝেমইধ্যে গাইলও দেয়, তয় খেপায় বেশি। ’ স্যার আরও অধিক আশ্চর্য হয়ে জানতে চান, ‘এমন কথা বলে খেপানোর কারণটা কী? একটু বলেন তো, হেলু ভাই!’
‘আব্বা তখন হাত দিয়া একটু দূরে বসে থাকা হুম্যানকে দেখিয়ে বলেন, কারণটা আসলে ওই হুম্যান। নির্মল স্যার আব্বার হাত অনুসরণ করে হুম্যানকে দেখে আরও অধিক আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাই থাকে। আব্বা তখন ঘটনা খোলাসা কইরা বলেন, ‘শুনেন স্যার, আমি একদিন সক্কাল সক্কাল ফজর নামাজের পর রিকশা নিয়া বার হইছিলাম। বনানীর কাছাকাছি ডাস্টবিনটা ক্রস করবার সময় দেখি এই হুম্যান একটা বাচ্চারে মুখে নিয়া ফ্যালফ্যাল চোখে দাঁড়াইয়া আছে আর বাচ্চাটা কানতাছে। বাচ্চাটার ঘাড়ের চামড়ায় কামড় দিয়া ধরে রাখছিল হুম্যান। আমি রিকশা থেকে নাইমা তাড়াতাড়ি করে কাছে যাইতেই হে আমার কাছে বাচ্চাটারে দিয়া দেয়। দেইখাই বুঝছি স্যার, কয়েক ঘণ্টা আগে জন্ম হইছে। রাস্তার আশপাশে তখন কোথাও কোনো মানুষ আছিল না। আমার নিজেরও কোনো সন্তানাদি নাই। আমি স্যার বাচ্চাটারে গামছা দিয়া প্যাঁচাইয়া এক হাতে বুকে ধইরা আরেক হাতে হ্যান্ডল ধইরা তাড়াতাড়ি রিকশা চালাইয়া ঘরে চইলা আসি। আমার পিছন পিছন ছুটতে ছুটতে হুম্যানও চইলা আসছে। এর পর থেকে আর কোথাও যায় নাই। আমাদের সাথেই থাকে। মতিরে দেখেশুনে রাখে। ’
‘আব্বার কথা শুনে নির্মল স্যার হুম্যানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী বলেছিল ঘরের ভেতর থেকে আমি শুনতে পাই নাই। তবে আব্বা কইত, ‘স্যার নাকি বলছিল, ওই আসল হুম্যান।’ বড়বেলায় আমি আব্বার উচ্চারণ সংশোধন করে দিয়ে বলতাম, ‘স্যার হুম্যান বলে নাই আব্বা, বলছিল ওই আসল হিউম্যান। আপনার এই ভুল উচ্চারণের জন্যই আমার সব সার্টিফিকেট ও কগজপত্রে স্যারেরা পিতার নাম লিখছেন হুমায়ুন মিয়া। আপনি হিউম্যান না বলে বলছেন হুম্যান আর স্যারেরা তা সংশোধন করে লিখে দিছে “হুমায়ুন”।’ আমার এই সব কথা শুনে আব্বারে নিয়া আম্মা হাসি-তামাশা করত। ’
‘নির্মল স্যার আব্বাকে ওই দিন আরও একটা কথা বলছিল, ‘হেলু ভাই, গ্রামে যান আর যেখানেই যান, কথাটা গোপন রাইখেন, কাউরে কখনো আর বইলেন না। বললে সবখানে, সব জায়গাতেই কেউ না কেউ মতিরে খেপাইব। ’
‘পরে আমারে আর আম্মারেও এই নিষেধ দিছিলেন আব্বা কাউরে কিছু না বলতে। কিন্তু নিজের আসল পরিচয় দিতে না পারা যে কত কষ্টের, আমার আব্বা মোহাম্মদ হেলু মিয়া তা জানতেন না। আপনারাও তা জানেন না। আমি জানি। আপনাদের সামনে দাঁড়ানো এই মতিউর রহমান মতি তা হাড়ে হাড়ে জানে।
‘আজ এইখানে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ও আমার স্কুল-কলেজের জ্ঞানী-গুণী শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকেরা আছেন। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বিরা আছেন। আমি আপনাদের সকলের কাছে একটা প্রশ্ন রেখে আমার কথা শেষ করতে চাই। “কুত্তার বাচ্চা” বলে আমাকে গালি দিলে অপমান হবে কার? আমার অজ্ঞাত জন্মদাতা পিতার, নাকি হুম্যান বা হিউম্যান নামের কুকুরটার?’
মতি কথা শেষ করার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত উপস্থিত সকলে মাথা নিচু করে বসে থাকলে সমাবেশজুড়ে আবারও এক আশ্চর্য নীরবতা নেমে আসে। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য অনুষ্ঠান আয়োজকেরা সচল হয়ে উঠলে ইস্পাতকঠিন শিরদাঁড়া সোজা রেখে মাথা উচু করে মতিউর রহমান মতি সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করতে পারলেও মঞ্চের ওপরে বা নিচে থাকা, বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা কেউ মাথা তুলে দেখতে পারেননি। চোখ তুলে তাকাতে পারেননি। মতির প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারার লজ্জায় নাকি সার্টিফিকেটে তার পিতার নাম হিসেবে একটি কুকুরের নাম থাকার লজ্জায়! সে প্রশ্ন সেখানে গুমট নীরবতায় ঘুরে ঘুরে ঘুরপাক খায়।
গল্প থেকে বাদ পড়া তথ্য : মতিরা গ্রামে আসার কয়েক মাস আগে বার্ধক্যের কারণে মারা গিয়েছিল হুম্যান বা হিউম্যান।