খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৬ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা ও উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য উজ্জ্বল নাম সুরবাহার বাদক ওস্তাদ আয়েত আলী খান। ১৮৮৪ সালের ২৬ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা সাবদার হোসেন খান ও মাতা সুন্দরী বেগম। তিনি এমন এক সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে সুর ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর সহোদর প্রখ্যাত সঙ্গীতগুরু ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান, যিনি উপমহাদেশের সংগীতধারায় এক বিশাল প্রভাব রেখে গেছেন।
শৈশব থেকেই আয়েত আলী খানের মধ্যে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ লক্ষ করা যায়। এই আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় তৎকালীন প্রখ্যাত সংগীতগুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সাহেবের কাছে, যিনি ঐতিহ্যবাহী ধ্রুপদী সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারার ধারক ছিলেন। তাঁর কাছেই দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে তালিম গ্রহণ করে আয়েত আলী খান সুরবাহার ও ধ্রুপদী সংগীতে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। সুরবাহার, যা সেতারের তুলনায় গভীর ও গুরুগম্ভীর সুরের জন্য পরিচিত, সেই বাদ্যযন্ত্রে তাঁর পারদর্শিতা তাঁকে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
পরবর্তীতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে তিনি শান্তিনিকেতনের সংগীত বিভাগে অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেন এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরার ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। কিছুদিন পর তিনি নিজ দেশে ফিরে এসে সংগীতচর্চা ও শিক্ষাদানে মনোনিবেশ করেন।
তাঁর পরিবারও ছিল সংগীতচর্চায় সমৃদ্ধ। এগারো সন্তানের মধ্যে অনেকেই সংগীতকে পেশা ও সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে আম্বিয়া খানম, ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান, বাহাদুর হোসেন খান, মোবারক হোসেন খান, মমতা খানম, শেখ সাদী খান, তানসেন খান ও ইয়াসমিন খানম উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মাধ্যমে তাঁর সংগীত ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তার লাভ করে।
১৯৫১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান রেডিওতে তাঁর নিয়মিত সুরবাহার পরিবেশনা তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। তাঁর পরিবেশনায় ধ্রুপদী রাগের গভীরতা ও মাধুর্য শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৬০ সালে তিনি গভর্নর পদক লাভ করেন, ১৯৬৬ সালে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ সম্মাননা অর্জন করেন এবং ১৯৭৬ সালে মরণোত্তর শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।
১৯৬৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর সুর, সাধনা ও অবদান আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে রয়েছে। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, বরং আমাদের সংগীত ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ, যাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টি চিরকাল প্রেরণা জোগাবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।