খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চিরন্তন সৌন্দর্যের পূজারি
“সৌন্দর্যই সত্য, সত্যই সৌন্দর্য”— এই অমর পঙক্তিটি শুধু একটি কবিতার চরণ নয়, মানবজীবনের নন্দনদর্শনের এক শাশ্বত ঘোষণা। এই চরণের রচয়িতা, রোমান্টিক যুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র জন কিটস— যিনি স্বল্পায়ু জীবনেও বিশ্বসাহিত্যে রেখে গেছেন অনন্য দীপ্তি।
জন্ম ও শৈশব:
১৭৯৫ সালের ৩১ অক্টোবর লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন কিটস। তাঁর পিতা টমাস কিটস প্রথমে একটি আস্তাবলে কর্মচারী ছিলেন, পরে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কন্যাকে বিয়ে করে মালিকানা লাভ করেন। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে জন কিটস ছিলেন অন্যতম।
এনফিল্ডের জন ক্লার্কের স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। ছোট হলেও স্কুলটির শিক্ষাব্যবস্থা ছিল আধুনিক ও সৃজনমুখী। সেখানেই চার্লস কাউডেন ক্লার্কের সংস্পর্শে এসে কিটসের কবি-প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। সাহিত্য ও সংগীতময় পরিবেশ তাঁর কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে।
দুঃখের ছায়া ও সংগ্রাম:
মাত্র আট বছর বয়সে (১৮০৪) পিতার মৃত্যু এবং ১৮১০ সালে মায়ের ক্ষয়রোগে মৃত্যু— শৈশবেই তাঁকে অনাথ করে দেয়। পিতামহীর তত্ত্বাবধানে বড় হতে হতে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষানবিশ হন। পরে লন্ডনের সেন্ট টমাস’ হাসপাতালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হলেও মন পড়ে থাকে কবিতার জগতে।
অবশেষে তিনি চিকিৎসা পেশা ত্যাগ করে সাহিত্যচর্চায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।
সাহিত্যজীবনের উন্মেষ:
১৮১৪ সালে রচনা করেন তাঁর প্রথম কবিতা “স্পেন্সারের অনুকরণ”।
১৮১৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ “কবিতা”।
পরবর্তীতে দীর্ঘ কাব্য “এন্ডিমিয়ন” (১৮১৮) তাঁকে আলোচনায় আনে। এর প্রথম লাইন—
“সৌন্দর্যের জিনিস চিরকালের জন্য আনন্দের”
আজও বিশ্বসাহিত্যের অমর উচ্চারণ।
১৮১৯ সাল ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার শ্রেষ্ঠ সময়। এ বছর তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত ওডসমূহ—
“একটি নাইটিঙ্গেলের প্রতি ওড”
“গ্রীক কলসের উপর ওড”
“শরতে”
প্রকৃতি, প্রেম, বেদনা ও সৌন্দর্যের মূর্ত রূপ এসব কবিতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে।
প্রেম ও বেদনা
কিটস প্রেমে পড়েছিলেন ফ্যানি ব্রাউন নামের এক তরুণীর। কিন্তু আর্থিক অনিশ্চয়তা ও শারীরিক দুর্বলতা তাঁদের সম্পর্ককে পূর্ণতা পেতে দেয়নি। ব্যক্তিগত বেদনা, ভাই টমের মৃত্যু, আর নিজের দেহে ধরা পড়া ক্ষয়রোগ— সব মিলিয়ে জীবন তাঁর জন্য হয়ে ওঠে এক কঠিন সংগ্রাম।
শেষ যাত্রা
১৮২০ সালে তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ “লামিয়া, ইসাবেলা, সেন্ট অ্যাগনেসের প্রাক্কালে এবং অন্যান্য কবিতা” প্রকাশিত হয়। সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি ইতালি যান।
১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, রোমে, মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সমাধিফলকে লেখা—
“এখানে একজন শুয়ে আছেন যার নাম জলে লেখা ছিল।”
কিন্তু সত্যিই কি তাঁর নাম জলে লেখা ছিল? না— সময় প্রমাণ করেছে, তাঁর নাম খোদাই হয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের পাথরে।
অমরত্বের কারণ
স্বল্পায়ু জীবনে কিটস যে গভীর সৌন্দর্যবোধ, মানবিক বেদনা ও নন্দনচেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা তাঁকে রোমান্টিক কবিদের অন্যতম শীর্ষস্থানে আসীন করেছে। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ বা পার্সি বাইশে শেলি–এর সমসাময়িক হয়েও তিনি নিজস্ব কাব্যভঙ্গিতে অনন্য।
জন কিটস আমাদের শেখান—
সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক নয়, তা অনুভবের গভীরে।
সত্য কেবল যুক্তিতে নয়, তা হৃদয়ের আলোয়।
স্বল্প জীবন, কিন্তু অসীম সৃষ্টি—
এই কারণেই জন কিটস চিরকালীন সৌন্দর্যের পূজারি।