খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, কলাম লেখনির জগৎ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক সুপরিচিত নাম ছিলেন বিভুরঞ্জন সরকার। তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, কলামিস্ট, সম্পাদক ও লেখক—যিনি দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর লেখনী, প্রজ্ঞা ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার মাধ্যমে দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৫৪ সালের ৬ জুন পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায় তাঁর জন্ম। ষাটের দশকের শেষদিকে স্কুলছাত্র থাকা অবস্থায়ই ‘দৈনিক আজাদ’-এর মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি। সেই সময় থেকেই তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের দিনাজপুর জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং পরবর্তীকালে সাপ্তাহিক জয়ধ্বনি, একতা, যায়যায়দিন, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক রূপালীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক চলতিপত্র, দৈনিক মাতৃভূমি এবং সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ। তাঁর সম্পাদিত দৈনিক মাতৃভূমি-তে নওগাঁর রানীনগর উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কিছুদিন কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। কাছ থেকে তাঁর কর্মনিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
আশির দশকের মধ্যভাগে প্রকাশিত সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে লেখা তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধগুলো পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ, স্পষ্ট বক্তব্য এবং সময়-সচেতন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি ছিলেন বিশেষভাবে সমাদৃত।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে অসংখ্য বিশ্লেষণধর্মী কলাম লিখেছেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ইত্তেফাক, যুগান্তর, সংবাদ ও বর্তমানসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায়।
লেখক হিসেবেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশের অধিক। ২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দুটি গ্রন্থ— ‘বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের নির্মাতা’ এবং ‘শেখ হাসিনা: স্বপ্ন পূরণের সফল কারিগর’।
বোদা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, দিনাজপুর সরকারি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যয়ন শেষে তিনি অর্জন করেন সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল একজন সচেতন নাগরিক, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ এবং সমাজ-রাজনীতির নিবেদিত পর্যবেক্ষক হিসেবে।
২০২৫ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। পরদিন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মেঘনা নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর এই আকস্মিক ও বেদনাদায়ক প্রস্থান দেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল। অনেকের বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও নিপীড়নের ভার বহন করতে করতেই তিনি জীবনের কাছে পরাজিত হয়েছেন।
আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই প্রজ্ঞাবান সাংবাদিক, নির্ভীক কলামিস্ট ও আলোকিত চিন্তার মানুষটিকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, বিভুরঞ্জন সরকার।
আপনার লেখনী, আপনার চিন্তা ও আপনার সাহসী উচ্চারণ বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।