খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
“এক পরদেশী মেরা দিল লে গায়া…”
সুরের ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসে এক মুখ—অমলিন, অপার্থিব, অবিনশ্বর।
স্মরণে
সৌন্দর্যের দেবী — মধুবালা
ফুল ঝরে যায়, ঋতু বদলায়—কিন্তু মধুবালা ঝরে যান না। তিনি বেঁচে থাকেন রূপালি পর্দার আলোয়, প্রেমিক হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাসে, আর এক অনন্ত সৌন্দর্যের প্রতীকে। কোটি মানুষের হৃদয়ে ঢেউ তোলা এই অভিনেত্রীর জীবন যেন নিজেই এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য।জন্ম ও শৈশবের অন্ধকার
১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, দিল্লির এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন তিনি। আসল নাম মমতাজ জাহান দেহলভী। বাবা আতাউল্লাহ খান চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই)।
শৈশব থেকেই জীবনের নির্মমতা তাঁকে স্পর্শ করে। অল্প বয়সেই হারান কয়েকজন ভাইবোনকে। ১৯৪৪ সালের বোম্বে ডক বিস্ফোরণে তাদের ঘরবাড়িও ধ্বংস হয়ে যায়। সেই দুর্দিনে পরিবারের একমাত্র আশার আলো হয়ে ওঠেন ছোট্ট মমতাজ।
পর্দায় প্রথম আলো
মাত্র ৯ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু। তাঁর সহজাত প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন প্রযোজকরা। কিংবদন্তি অভিনেত্রী দেবিকা রানী তাঁর সৌন্দর্য ও অভিনয়গুণে অভিভূত হয়ে নতুন নাম দেন—মধুবালা।
১৯৪৭ সালে ‘নীল কমল’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ। সহ-অভিনেতা ছিলেন রাজ কাপুর। এ ছবিই ছিল শেষবার, যখন তিনি ‘মমতাজ’ নামে পর্দায় আসেন।
তারকাখ্যাতির বিস্ফোরণ
১৯৪৯ সালে মুক্তি পায় ‘মহল’। এই ছবিই তাঁকে রাতারাতি মহাতারকা বানায়। গথিক রহস্যময়তার আবহে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি দর্শককে বিমোহিত করে।
এরপর একে একে ‘দুলারি’, ‘তারানা’, ‘বেকসুর’, ‘বাদল’—প্রতিটি ছবিতেই তাঁর রূপ ও অভিনয় যেন নতুন মাত্রা পায়।
১৯৫২ সালে আমেরিকান ম্যাগাজিন Theatre Arts তাঁকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। হলিউডের কিংবদন্তি পরিচালক Frank Capra তাঁকে আমন্ত্রণও জানান। কিন্তু পিতার অনীহায় সেই সুযোগ আর বাস্তব হয়নি।
প্রেম, অভিমান ও বিচ্ছেদ
‘তারানা’ ছবির সেটে তাঁর পরিচয় ও প্রেম দিলীপ কুমার-এর সঙ্গে। লাল গোলাপ আর উর্দুতে লেখা চিরকুটে শুরু হয়েছিল সেই প্রেমকথা।
দুজনেই একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। কিন্তু সম্পর্কের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান পিতা আতাউল্লাহ খান। অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রযোজনা সংক্রান্ত বিরোধ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
‘নয়া দৌড়’ ছবির শুটিং নিয়ে আইনি জটিলতা সম্পর্ককে চূড়ান্ত ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার চেয়ে পরিবারকেই বেছে নেন মধুবালা।
পরবর্তীতে তিনি বিয়ে করেন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী কিশোর কুমার-কে। তবে দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। অতীতের প্রেম তাঁর হৃদয়ে অমলিনই থেকে যায়।
অমর কীর্তি — ‘মুঘল-ই-আজম’
১৯৬০ সালে মুক্তি পায় ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র মুঘল-ই-আজম। অনারকলির ভূমিকায় তাঁর অভিনয় ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। শুটিং চলাকালে অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি যে নিবেদন দেখিয়েছেন, তা আজও কিংবদন্তি।
অসুস্থতা ও বিদায়
শৈশব থেকেই হৃদরোগে ভুগছিলেন—হৃদপিণ্ডে ছিদ্র ছিল। অসুখ গোপন রাখা হয়েছিল কাজ হারানোর ভয়ে। ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থা অবনতি হতে থাকে।
দীর্ঘ ৯ বছরের যন্ত্রণাময় শয্যাশায়ী জীবনের পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীকে বিদায় জানান।
যে সৌন্দর্য মৃত্যুকে অতিক্রম করে
মধুবালা কেবল একজন অভিনেত্রী নন—তিনি এক আবেগ, এক রূপকথা, এক অপূর্ণ প্রেমের প্রতীক। তাঁর জীবন যেমন আলোয় ভরা, তেমনি ছায়াঘন বেদনায় আচ্ছন্ন।
তিনি চলে গেছেন—কিন্তু তাঁর হাসি, তাঁর চোখের ভাষা, তাঁর প্রেম আর অভিমান আজও বেঁচে আছে।
ফুল মরে যায়,
কিন্তু মধুবালা মরেন না।
তিনি ফিরে আসেন—প্রতিটি বসন্ত রাতে, প্রতিটি প্রেমিক হৃদয়ের নিঃশ্বাসে।