এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে কিছু নাম চিরদিনের জন্য অমলিন। নার্গিস তেমনই এক কিংবদন্তি, যিনি তাঁর অভিনয়, অভিব্যক্তি আর মাধুর্য দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন।
১৯২৯ সালের ১ জুন, কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ফাতিমা রশিদ। ছোটবেলা থেকেই সংগীত ও অভিনয়ের আবহে বেড়ে ওঠা—কারণ তাঁর মা জাদ্দানবাই ছিলেন একজন খ্যাতনামা গায়িকা ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। সেই সূত্রেই খুব অল্প বয়সে রুপালি পর্দায় পা রাখা।
নার্গিসের অভিনয়জীবন শুরু হয় শিশু শিল্পী হিসেবে, আর দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন হিন্দি সিনেমার অন্যতম শীর্ষ নায়িকা। তাঁর অভিনয়ে ছিল এক অপূর্ব স্বাভাবিকতা—যা দর্শককে চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম করে দিত।
বিশেষ করে মাদার ইন্ডিয়া চলচ্চিত্রে ‘রাধা’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়। এই ছবিটি একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল—যা সে সময়ের জন্য ছিল এক বিরাট অর্জন। একজন সংগ্রামী মায়ের চরিত্রে তাঁর দৃঢ়তা, ত্যাগ আর আবেগ আজও অনন্য।
চলচ্চিত্রে তাঁর অনবদ্য জুটির কথা বলতে গেলে রাজ কাপুর-এর নাম আসবেই। তাঁদের জুটি ‘আওয়ারা’, ‘শ্রী ৪২০’সহ বহু ছবিতে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
পরবর্তীতে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ সুনীল দত্ত-এর সঙ্গে। মজার বিষয়, ‘মাদার ইন্ডিয়া’ চলচ্চিত্রে যিনি তাঁর ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, বাস্তব জীবনেই তিনিই হয়ে ওঠেন তাঁর জীবনসঙ্গী।
তাঁদের সন্তানদের মধ্যে সঞ্জয় দত্ত আজকের বলিউডের একজন সুপরিচিত অভিনেতা। এছাড়াও কন্যা প্রিয়া দত্ত ও নম্রতা দত্ত নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
নার্গিস অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
‘আওয়ারা’, ‘মেলা’, ‘বাবুল’, ‘জোগান’, ‘দীদার’, ‘চোরি চোরি’—প্রতিটি ছবিতেই তাঁর অভিনয় ছিল হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।
শুধু অভিনয়েই নয়, মানবিক কর্মকাণ্ডেও তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
১৯৮১ সালের ৩ মে, অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে মাত্র ৫১ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্ট শিল্প, তাঁর স্মৃতি—আজও অম্লান, অমর।
আপনি নেই, তবুও আপনার ছায়া রয়ে গেছে প্রতিটি সাদা-কালো ফ্রেমে,
প্রতিটি সুরে, প্রতিটি আবেগে—এক অনির্বচনীয় মায়ার মতো।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি মেলোডির সেই চিরন্তন রাণীকে।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক,খবরওয়ালা