খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘গণভোট’ প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বর্তমানে যে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে, তার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। সম্প্রতি ভোলার লালমোহন উপজেলার উত্তর বাজার এলাকার মদন মোহন মন্দির প্রাঙ্গণে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
মেজর হাফিজ তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন যে, গণভোটের এই ধারণাটি মূলত ঢাকার একটি বিশেষ ‘এলিট গোষ্ঠী’ বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির মস্তিষ্কপ্রসূত, যা সাধারণ মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি নীতিগতভাবে শুরু থেকেই এই গণভোটের প্রক্রিয়ার সাথে একমত ছিল না। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার স্বার্থে দলটিকে কিছুটা নমনীয় হতে হয়েছে।
তার মতে, বিএনপি আশঙ্কা করেছিল যে যদি তারা গণভোটে রাজি না হয়, তবে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ কখনোই তৈরি হবে না, এমনকি নির্বাচন প্রক্রিয়াটিই অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এই বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই অনেকটা বাধ্য হয়ে বিএনপি ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষর করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মনে করেন, সংবিধানের মতো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল পরিবর্তনের এখতিয়ার কেবল জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। কোনো অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় এটি করা হলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
নিচে গণভোট এবং সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার একটি তুলনামূলক পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | গণভোট (Referendum) | সংসদীয় পদ্ধতি (Elected Parliament) |
| আইনি ভিত্তি | বর্তমান সংবিধানে এর প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। | সংবিধানের নির্ধারিত ধারা অনুযায়ী বৈধ। |
| জনপ্রতিনিধিত্ব | সরাসরি জনগণের ‘হ্যাঁ/না’ ভোট, কিন্তু আলোচনার সুযোগ কম। | নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ও পর্যালোচনার সুযোগ থাকে। |
| প্রস্তুতি | দেশের সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। | দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক কাঠামো। |
| রাজনৈতিক প্রভাব | অনেক সময় বিশেষ গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঝুঁকি থাকে। | বৃহত্তর জনমতের প্রতিফলন ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে। |
মেজর হাফিজ আরও বলেন, যে পদ্ধতিতে বর্তমানে গণভোটের প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তিনি মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেকোনো বড় পরিবর্তনের আগে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটা জরুরি। কেবল বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর সন্তুষ্টির জন্য তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা দেশের জন্য শুভ হবে না।
ভোলা-৩ আসনের এই সাবেক সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপরও জোর দেন। তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আশ্বস্ত করেন যে, বিএনপি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধপরিকর। গণভোট ইস্যুতে তার এই সাহসি ও স্পষ্ট অবস্থান বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং দলের অভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয় নীতি নির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।