খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পুরা নাম আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ ।যিনি ইতিহাসে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ নামেই অমর—ছিলেন উপমহাদেশের এক বিরল প্রতিভা। তিনি যেমন ছিলেন ইসলামী ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত আলেম, তেমনি ছিলেন প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত সাংবাদিক, দূরদর্শী রাজনীতিক এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী।
১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর পবিত্র নগরী মক্কা-য় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল আফগানিস্তানের হেরাত; পরে পরিবারটি ভারতবর্ষে বসতি স্থাপন করে। শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন—আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং কৈশোরেই লেখালেখি শুরু করেন।
কলমের মাধ্যমে সংগ্রাম
আজাদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা আল-হিলাল ও আল-বালাগ ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতেন—ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করার নয়, বরং ন্যায় ও মানবতার পথে ঐক্যবদ্ধ করার শক্তি।
স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রদূত
খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি ঘনিষ্ঠ হন মহাত্মা গান্ধী-র। ১৯২৩ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় (১৯৪০–১৯৪৫) তিনি টানা পাঁচ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং দীর্ঘ কারাবাসও সহ্য করেন।
দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের তিনি ছিলেন দৃঢ় বিরোধী। তাঁর বিশ্বাস ছিল—ভারত একটি অভিন্ন সভ্যতার মিলনভূমি; হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানই তার শক্তি। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তাঁর বহু রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল বিস্ময়করভাবে সত্যপ্রমাণিত।
স্বাধীন ভারতের শিক্ষার রূপকার
স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত গড়ে দেন। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় Indian Institutes of Technology (IIT) এবং University Grants Commission (UGC)। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও সর্বজনীন করার ওপর গুরুত্ব দেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯২ সালে তাঁকে মরণোত্তর ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয়। তাঁর জন্মদিন ১১ নভেম্বর ভারতে জাতীয় শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
মানবতাবাদী এক প্রজ্ঞাবান নেতা
মৌলানা আজাদ ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করতেন—
“শিক্ষাই মানুষের মুক্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত।”
১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এই মহান মানবতাবাদী রাজনীতিবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও শিক্ষাদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক—বিশেষত সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অস্থির সময়ে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি সেই প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ককে, যিনি ঐক্য, শিক্ষা ও মানবতার পথ দেখিয়েছিলেন।