খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেশে ধর্মীয় চরমপন্থার প্রসার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রে—এ ধরনের কার্যক্রম এখন দৃশ্যমান। চরমপন্থী চিন্তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, কারণ এর তৎপরতা, সংযুক্তি, বিতর্ক এবং অনুসারীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কানাডাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেকডেভের ডিসেম্বর ২০২৫-এর “শ্যাডোজ ওভার দ্য ব্যালট” রিপোর্টে বাংলাদেশের চরমপন্থার গতিশীলতা ও আধিপত্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সেকডেভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংস চরমপন্থী গোষ্ঠী জন-অসন্তোষ, নারী ইস্যু, ভারতবিরোধিতা, আওয়ামী লীগের অপশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের ভূমিকার প্রশ্ন ব্যবহার করে নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করছে। এরিও ডব্লিউ ক্রগোল্যাংকির “The Three Pillars of Radicalization” (2019) অনুযায়ী চরমপন্থার ক্ষেত্রে তিনটি মূল উপাদান রয়েছে—নিডস, ন্যারেটিভ, নেটওয়ার্ক।
চরমপন্থীরা সমাজে প্রয়োজনীয়তা তৈরি, বয়ান গঠন এবং নেটওয়ার্ক বিস্তারের মাধ্যমে মানুষের ভেতরের অভাব, প্রতিশোধপরায়ণতা ও নিরাপত্তাহীনতাকে কাজে লাগায়। ডেভিড জ্যাকম্যান তাঁর গ্রন্থ “Syndicates and Societies: Criminal Politics in Dhaka” (2024)-এ উল্লেখ করেছেন, এই সিন্ডিকেটগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং মানসিক উত্তেজনা বজায় রাখতে সক্ষম।
ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসা দেখিয়েছেন, অনলাইন ইমপিউনিটি ধীরে ধীরে অফলাইন ইমপিউনিটিতে রূপ নেয়, যা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সেকডেভের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার নেটওয়ার্কে অনলাইন সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৩ কোটির বেশি। ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের মাধ্যমে তারা তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে অপতথ্য ছড়ায়।
| প্ল্যাটফর্ম | ব্যবহারকারী সংখ্যা (মিলিয়ন) | লক্ষ্যবস্তু | লক্ষ্যপূর্ণ কার্যক্রম |
|---|---|---|---|
| ফেসবুক | ৬.৪০ | তরুণ সমাজ | অপতথ্য, ভেরিফিকেশনহীন ন্যারেটিভ |
| টিকটক | ৫.৬২ | তরুণ সমাজ | ভিডিও, ডিপফেক, তথ্য বিকৃতি |
| ইউটিউব | ৪.৯৮ | তরুণ সমাজ | সম্পাদিত ভিডিও, প্রোপাগান্ডা |
দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৭% ২৫ বছরের নিচে। ফলে দেড় কোটি তরুণ ভোটারের মধ্যে ভোটের প্রতি অনাস্থা তৈরি হলে চরমপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী গণতন্ত্রকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে এবং সরাসরি শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ভোট ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। সেকডেভের বিশ্লেষণে ১৫ হাজার পোস্ট থেকে দেখা গেছে, চরমপন্থীরা গণতন্ত্রকে অইসলামিক ও মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে প্রচার করছে।
চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো তাকফিরিবাদ, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমানদের ধর্মচ্যুত ঘোষণা করা হয়। এতে ‘ভেতরের শত্রু’ ধারণা তৈরি হয় এবং সহিংসতা ন্যায্য হিসেবে প্রচারিত হয়। দেশীয় কার্যক্রমে তেহরিক-ই–তালিবান ও আল-কায়েদার মতাদর্শের প্রভাব স্পষ্ট।
ধর্মীয় চরমপন্থা মোকাবিলায় একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নাগরিক অধিকার এবং মানবিক সংস্কৃতির প্রসারই সবচেয়ে কার্যকর পথ। সমাজে বিস্তৃত সংলাপ, সমঝোতা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও বিকল্প আদর্শ প্রচার করে সহিংসতা হ্রাস করা সম্ভব।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশই ধর্মীয় চরমপন্থা প্রতিরোধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব, যা সহিংসতার চক্র ভেঙে সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে।