খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জীবনের গতিপথ বড়ই বিচিত্র। কখন কার ডাক চলে আসে, তা আগে থেকে বলা অসম্ভব। তবে মাঝেমধ্যে কিছু ঘটনা এমনভাবে মিলে যায়, যা দেখলে মনে হয় মানুষ হয়তো অবচেতনে নিজের বিদায়ের সুর শুনতে পায়। তেমনই এক বিষাদময় ঘটনার সাক্ষী হলেন কক্সবাজারের বাসিন্দারা। নিজের জন্মভূমি সেন্ট মার্টিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার এবং বাবা-মায়ের পাশে শায়িত হওয়ার যে অন্তিম ইচ্ছা তরুণ উদ্যোক্তা আবদুল মালেক প্রকাশ করেছিলেন, আজ তা এক নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সী টগবগে যুবক আবদুল মালেক। কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা বড় ধরনের কোনো বিপদ ছিল না তাঁর জীবনে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলের বায়োতে লিখেছিলেন, ‘মৃত্যুর পর আমার লাশটি জন্মভূমি সেন্ট মার্টিনে বাবা–মায়ের কবরের পাশে শায়িত করিও।’ এই বাক্যটি আজ তাঁর স্বজনদের চোখের জলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ বুধবার দুপুরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এই স্বপ্নবাজ যুবক।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ বুধবার বেলা তিনটার দিকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাংলাবাজার এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। মালেক সৌদি আরব যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং এ লক্ষ্যে রামুর জোয়ারিয়ানালা বিকেএসপি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তিন দিনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন। আজ প্রশিক্ষণ শেষে অটোরিকশাযোগে কক্সবাজার শহরে ফেরার পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাকের সঙ্গে তাঁদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারণি:
| তথ্যের ধরণ | বিবরণ |
| নিহতের নাম | আবদুল মালেক (৩৩) |
| স্থায়ী ঠিকানা | ১ নম্বর ওয়ার্ড, পশ্চিম পাড়া, সেন্ট মার্টিন |
| পেশা ও যোগ্যতা | এলএলএম ডিগ্রিধারী, রিসোর্ট ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক |
| দুর্ঘটনার স্থান | বাংলাবাজার এলাকা, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক |
| দুর্ঘটনার কারণ | অটোরিকশা ও মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ |
| অন্তিম গন্তব্য | বাবা-মায়ের কবরের পাশে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ |
আবদুল মালেক কেবল একজন সাধারণ যুবক ছিলেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ও কর্মঠ। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (এলএলএম) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। আইন পেশার পাশাপাশি পর্যটন নগরী সেন্ট মার্টিনে তাঁর নিজস্ব ‘সি-প্রবাল’ নামের একটি রিসোর্ট ছিল। এ ছাড়া তিনি সাংবাদিকতা ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের মাধ্যমে দ্বীপের সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরতেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে সেন্ট মার্টিনের পর্যটন ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দিন জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত শেষে মালেকের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মালেকের পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে করা শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সেন্ট মার্টিনে দাফন করা হবে। অ্যাম্বুলেন্সযোগে সড়কপথে টেকনাফ নেওয়ার পর সেখান থেকে বিশেষ ট্রলারে করে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে তাঁর নিথর দেহ নেওয়া হবে নারিকেল জিঞ্জিরা খ্যাত সেন্ট মার্টিনে। সেখানেই দীর্ঘদিনের বিরহ শেষে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন এই তরুণ।
এমন এক মেধাবী ও স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণের মৃত্যু ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। মালেকের এই চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং দ্বীপের তরুণ সমাজের জন্য এক বড় শূন্যতা।