খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজধানীসহ সারাদেশে ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতা রুখতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন নবনিযুক্ত আইজিপি আলী হোসেন ফকির। বিশেষ করে জামিনে মুক্তি পাওয়া অপরাধীরা যাতে পুনরায় অপরাধ জগতে ফিরে যেতে না পারে, সে লক্ষ্যে তিনি এক অভিনব নজরদারি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। আইজিপির মতে, চিহ্নিত অপরাধীদের এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট থানায় হাজির হয়ে তাদের বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশকে অবহিত করতে হবে।
আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরদিন বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা সরেজমিনে তদারকি করতে যান আলী হোসেন ফকির। সেখানে তিনি জেনিভা ক্যাম্প, টাউন হল এবং তিন রাস্তার মোড় পরিদর্শন করেন। মোহাম্মদপুর থানা পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হয়। এই চক্র ভাঙতে এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
আইজিপি স্পষ্ট করে বলেন, “জামিনে আসার পর অপরাধীদের প্রতি সপ্তাহে ওসির কাছে এসে হাজিরা দিতে হবে এবং তারা যে ভালো পথে চলছে, তার প্রমাণ দিতে হবে। আমরা ইতিমধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু করেছি।” এই উদ্যোগের ফলে অপরাধীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হবে এবং তাদের গতিবিধি পুলিশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাদককে বর্তমান প্রজন্মের জন্য প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে আইজিপি জানান, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মাদকের নীল দংশনে একটি পুরো প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনাদের সন্তানরা কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—সেদিকে কড়া নজর রাখুন। পুলিশের একার পক্ষে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়, এতে সামাজিক সহযোগিতার বিকল্প নেই।”
পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে আইজিপি তার সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরেন। তিনি জানান, পুলিশের ফিল্ড লেভেল বা মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা এমন একটি পোশাক চান যা সাধারণ মানুষের চোখে সহজেই দৃশ্যমান হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের চালু করা পোশাক নিয়ে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের আপত্তির বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন। তবে তিনি মনে করেন, কেবল বাহ্যিক পোশাক পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী পুলিশের প্রধান সংস্কারগুলো নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| সংস্কারের ক্ষেত্র | আইজিপির প্রস্তাবনা ও লক্ষ্য |
| দৃশ্যমান পোশাক | মাঠ পর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা। |
| মানসিক পরিবর্তন | পুলিশকে প্রকৃত জনসেবক হিসেবে গড়ে তোলা এবং পজিটিভ অ্যাটিচিউড নিশ্চিত করা। |
| হলিডে মার্কেট | ফুটপাত দখলমুক্ত করে হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া। |
| দুর্নীতি প্রতিরোধ | প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। |
রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানোর বিষয়ে আইজিপি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, হকারদের হুট করে উচ্ছেদ না করে প্রথমে মোটিভেশনাল কার্যক্রম চালানো হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পর স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক ‘হলিডে মার্কেট’ চালু করা হবে। এতে একদিকে যেমন রাস্তা সচল হবে, অন্যদিকে হকারদের জীবনযাত্রাও ব্যাহত হবে না। তিনি স্বীকার করেন যে, অতীতে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে চাঁদাবাজির কারণে ফুটপাত পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয়নি, যা এখন কঠোরভাবে দমন করা হবে।
পরিদর্শনকালে ঢাকার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার সরওয়ার এবং ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আইজিপির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। আইজিপি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, পুলিশ সদস্যরা রাস্তায় সক্রিয় থাকলে এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ালে আইন প্রয়োগে কঠোরতা বাড়বে এবং অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন করা সহজ হবে।