খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিয়ে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। দীর্ঘ নয় মাস পর মূল্যস্ফীতির এই হার আবারও ৯ শতাংশের ঘর অতিক্রম করল। এর আগে গত বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। মূলত চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য এবং জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিবিএস-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ, যার পর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের এই হারই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা সত্ত্বেও বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব খুব একটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির তুলনামূলক চিত্র
| মূল্যস্ফীতির খাত | জানুয়ারি ২০২৬ (%) | ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (%) | পরিবর্তনের হার |
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি | ৮.৫৮ | ৯.১৩ | + ০.৫৫ |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি | ৮.২৯ | ৯.৩০ | + ১.০১ |
| খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি | ৮.৮১ | ৯.০১ | + ০.২০ |
ফেব্রুয়ারি মাসের এই মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে খাদ্য খাত। বিবিএস-এর তথ্যমতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি জানুয়ারির ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে এক লাফে বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ গত বছরের তুলনায় একই পরিমাণ খাবার কিনতে ১০ শতাংশের কাছাকাছি বেশি টাকা ব্যয় করছে। বিশেষ করে মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল এবং বিভিন্ন মৌসুমি সবজির দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমদানিকৃত পণ্যের এলসি জটিলতা এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে।
কেবল খাদ্যপণ্যই নয়, জীবনযাত্রার অন্যান্য অনুসঙ্গেও খরচ বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। আবাসন, পরিবহন, পোশাক এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যয় নিয়ে গঠিত ‘খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি’ জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা ৯ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং গ্যাস-বিদ্যুতের বর্ধিত দামের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষা উপকরণ থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দামও বেড়েছে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের সঞ্চয় কমে গিয়ে জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যার মূল লক্ষ্য বাজারে টাকার প্রবাহ কমিয়ে চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করা। তবে ১২ মাসের গড় হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের উপরে ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়; বরং বাজার তদারকি জোরদার করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তার সুফল না পাওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। বর্তমান ধারায় মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।