খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-নীতি বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এটি তুলনা করেছে ফ্লোরিডার অস্থির আবহাওয়ার সঙ্গে। গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় ট্রাম্পের সামনে এখন চারটি প্রধান বিকল্প খুলে গেছে—যা প্রতিটিরই ঝুঁকি, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং রাজনৈতিক পরিণতি রয়েছে।
শুক্রবার (২০ মার্চ) ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত দিয়ে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের দাবি করলেও, মাত্র একদিন পর হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করা এই যুদ্ধে ট্রাম্পের চারটি বিকল্প হলো—কূটনৈতিক আলোচনা, বিজয় ঘোষণা করে সরে আসা, বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখা, অথবা সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি।
প্রথম বিকল্প হিসেবে কূটনৈতিক আলোচনা বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের প্রতি আস্থাহীন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধের দাবি করছে, কিন্তু ইরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন ঘাঁটি সরানোর শর্তে অনড়।
দ্বিতীয় বিকল্প হলো ট্রাম্প একতরফাভাবে ‘বিজয় ঘোষণা’ করে যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করা। উপদেষ্টা দল বলছে ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে এবং ইরান ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রাখলে, এই বিজয় ঘোষণা আন্তর্জাতিকভাবে অর্থহীন প্রমাণিত হতে পারে।
তৃতীয় পথটি হলো বর্তমান অবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থীরা আশা করছেন তেহরান সরকারের পতন ঘটতে পারে। তবে এর বিপরীতে শঙ্কা রয়েছে—ইরান গেরিলা হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালীকে অচল করে দিতে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতি অস্থির হবে এবং মার্কিন-ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যাবে।
চতুর্থ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ বিকল্প হলো সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রস্তাব করেছেন—ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা, খারগ দ্বীপ দখল এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ। তবে এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে মহাবিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আঘাতপ্রাপ্ত হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারে পাল্টা হামলা চালাবে।
গত ১৮ মার্চ কাতারের এলএনজি প্লান্টে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। খারগ দ্বীপ বা ইরানের মূল ভূখণ্ডে বড় হামলা হলে পুরো অঞ্চলের তেল ও গ্যাস স্থাপনা ধ্বংসের ঝুঁকিতে থাকবে।
নিম্নে চারটি বিকল্প সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিকল্প | বিবরণ | ঝুঁকি ও প্রভাব |
|---|---|---|
| কূটনৈতিক আলোচনা | শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা | পারস্পরিক আস্থা নেই, অসম্পূর্ণ সমঝোতা সম্ভাবনা |
| বিজয় ঘোষণা | একতরফাভাবে যুদ্ধ শেষ | হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে অর্থহীন প্রমাণিত |
| বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা | সীমিত বিমান হামলা চালানো | দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা, বিশ্ব অর্থনীতি অস্থিরতা, প্রতিরক্ষা চাপ |
| সংঘাত তীব্রতা বৃদ্ধি | বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ইউরেনিয়াম লক্ষ্য | মহাবিপর্যয়, প্রতিবেশী দেশ ক্ষতিগ্রস্ত, তেল-গ্যাস স্থাপনা ধ্বংস |
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও সম্মানজনকভাবে এটি শেষ করা ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো বিকল্পই স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। বাস্তবতা হলো—উপসাগরীয় স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মানবিক ঝুঁকি সকল বিকল্পেই গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার বিষয়।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট