খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আগামী ২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। তবে মাঠের ফুটবল শুরু হওয়ার আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে টুর্নামেন্টের আকাশচুম্বী ব্যয়ভার। বিশেষ করে ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের দাম এবং আনুষঙ্গিক খরচ সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আগামী ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ। ফিফার অফিশিয়াল রিসেল (পুনর্বিক্রয়) প্ল্যাটফর্মে এই ম্যাচের চারটি টিকিটের প্রতিটি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে প্রায় ২৩ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ কোটি ২১ লাখ টাকায়। গ্যালারির নিচতলার ১২৪ নম্বর ব্লকের গোলপোস্টের পেছনের এই আসনগুলোর অস্বাভাবিক দাম মূলত ফিফার ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতির ফল।
এই প্রক্রিয়ায় ফিফা সরাসরি দাম নিয়ন্ত্রণ না করলেও প্রতিটি লেনদেন থেকে বিপুল পরিমাণ লভ্যাংশ সংগ্রহ করছে। নিয়ম অনুযায়ী, ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষ থেকেই ১৫ শতাংশ করে মোট ৩০ শতাংশ কমিশন পায় ফিফা। আলোচিত চারটি টিকিট এই দামে বিক্রি হলে ফিফার পকেটে শুধু কমিশন বাবদই জমা হবে প্রায় ২৬ লাখ ৯৯ হাজার ডলার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে ফাইনাল ম্যাচের সর্বনিম্ন টিকিটের দামও দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০,৯২৩ ডলারে (প্রায় ১৩ লাখ টাকা)।
কেবল টিকিটের দামই নয়, আয়োজক শহরগুলোতে হোটেল ভাড়া ও যাতায়াত খরচও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৬টি আয়োজক শহরে বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীন হোটেল কক্ষের ভাড়া গড়ে চার গুণ বেড়েছে। মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচের দিন একটি হোটেলের ভাড়া ১৫৭ ডলার থেকে বেড়ে ৩,৮৮২ ডলারে পৌঁছেছে।
পরিবহন খাতেও একই চিত্র দৃশ্যমান। নিউ জার্সির পেন স্টেশন থেকে মেটলাইফ স্টেডিয়াম পর্যন্ত মাত্র ৩০ মিনিটের ট্রেন ভ্রমণে যেখানে স্বাভাবিক খরচ ১২.৯০ ডলার, সেখানে বিশ্বকাপের সময় তা ১৫০ ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। একইভাবে বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসা দর্শকদের জন্য পার্কিং ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭৫ থেকে ২২৫ ডলার পর্যন্ত।
| ব্যয়ের খাত | স্বাভাবিক/পূর্ব মূল্য | বিশ্বকাপকালীন মূল্য (প্রায়) | প্রবৃদ্ধির হার |
| ফাইনালের সাধারণ টিকিট (ফিফা নির্ধারিত) | ১০,৯৯০ ডলার | ১০,৯৯০ ডলার | – |
| ফাইনালের রিসেল টিকিট (সর্বোচ্চ) | – | ২২,৯৯,৯৯৮ ডলার | অত্যধিক |
| সেমিফাইনালের টিকিট (আর্লিংটন) | – | ১১,১৩০ ডলার | – |
| হোটেল ভাড়া (উদ্বোধনী ম্যাচ কেন্দ্রিক) | ১৫৭ ডলার | ৩,৮৮২ ডলার | প্রায় ২৫ গুণ |
| ট্রেন ভাড়া (নিউ জার্সি পেন স্টেশন – মেটলাইফ) | ১২.৯০ ডলার | ১৫০ ডলার | প্রায় ১২ গুণ |
| গাড়ি পার্কিং (মেটলাইফ স্টেডিয়াম) | – | ২২৫ ডলার | – |
| ফ্যান জোন প্রবেশমূল্য | বিনামূল্যে (সাধারণত) | ১২.৫০ ডলার | – |
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সফল কোচ পেপ গার্দিওলা এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ফুটবল মূলত সাধারণ দর্শকদের জন্য হলেও বর্তমানের এই বাণিজ্যিক ধারা সাধারণ মানুষকে খেলা থেকে বিচ্যুত করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ফিফা কেবল স্পনসর বা বাণিজ্যিক স্বার্থ না দেখে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করবে।
ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর ক্ষোভের মুখে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো পরিস্থিতির কিছুটা সামাল দিতে অতি সীমিতসংখ্যক টিকিট ৬০ ডলারে বণ্টনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই সুযোগ কেবল নির্দিষ্ট কিছু অনুগত সমর্থকই পাবেন। ফিফার দাবি, এই উচ্চমূল্য থেকে অর্জিত নিট মুনাফা বিশ্বব্যাপী ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ একদিকে যেমন ফুটবলের বৃহত্তম উৎসবে রূপ নিতে যাচ্ছে, অন্যদিকে এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ভার মধ্যবিত্ত দর্শকদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফিফার সমন্বয়হীনতা এবং ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতির প্রয়োগ এই আসরকে ইতিহাসের ব্যয়বহুলতম বিশ্বকাপে পরিণত করছে।