খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে টিকা সংকট বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ক্লোজ করা এবং সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। একই ঘটনায় আরেকজন কর্মচারীকেও বরখাস্ত করার কথা জানান তিনি।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে হাসপাতালটিতে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা (র্যাবিক্স-ভিসি) সংকটের কারণে রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনতে বাধ্য হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।
পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন এবং এটি “অ্যান্টি-স্টেট অ্যাক্টিভিটি” হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, টিকা সংকটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যথাযথভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের এমএসআর ফান্ড (ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় তহবিল) এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ ছিল।
পরবর্তীতে তিনি জেলার সিভিল সার্জন এবং একজন হাসপাতাল কর্মচারীর বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, মুন্সীগঞ্জে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার সংকটের কারণে রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনতে হয়েছে। ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীরও সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দেশে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে র্যাবিক্স-ভিসি টিকা প্রদান শুরু হয়। তবে ২০২৫ সালের শুরু থেকে দেশে এ টিকার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। একই সময়ে শিশুদের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি টিকার মজুতও কমে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, দেশের অনেক এলাকায় জলাতঙ্ক টিকা পাওয়া যাচ্ছে না এবং কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের বাইরে থেকে টিকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে টিকা ও ওষুধ সরবরাহ সাধারণত কেন্দ্রীয়ভাবে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) এবং সরকারের অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালে ওপি কাঠামো থেকে সরে আসার পর নতুন করে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, গত বছর থেকে জলাতঙ্ক টিকা এবং অন্যান্য কিছু টিকার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। প্রতিমাসে মুন্সীগঞ্জ জেলায় প্রায় ২৬০০ ভায়েল টিকার প্রয়োজন হয় বলে একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, যেখানে কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাধিক জেলার সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, টিকা ক্রয় ও সরবরাহ সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্ব, স্থানীয় পর্যায়ে এসব কেনার সুযোগ নেই।
একজন সিভিল সার্জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো টিকা বিতরণ ও সেবা নিশ্চিত করা, ক্রয় কার্যক্রম নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমদ বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা একটি ভুল দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, টিকা ও ওষুধ সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের উপর দায় চাপানো সঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, এমন পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে নিরুৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।