খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৬ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর। ঈদুল ফিতরের মাত্র চার দিন আগে।
ভাটির জনপদ হারায় তার এক দুর্ধর্ষ সন্তানকে— জগৎজ্যোতি দাস।
রাজাকার ও পাক হানাদারদের নির্মমতার এক জঘন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে তাঁর হত্যাকাণ্ড। অর্ধমৃত অবস্থায় তাঁকে আজমিরীগঞ্জ গরুর হাটে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে, শরীরে পেরেক ঠুকে জনসমক্ষে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।
হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরা তরুণ জ্যোতির নিথর দেহটি ঝুলে থাকে দীর্ঘক্ষণ— কোনো সৎকার ছাড়াই।
শেষ পর্যন্ত নির্মম যন্ত্রণার মধ্যেই তিনি প্রাণ ত্যাগ করেন। এরপর তাঁর দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয় কুশিয়ারা নদীর জলে।
মাত্র ২২ বছরের এক তরুণ— অথচ তাঁর বীরত্ব, তাঁর সাহস, তাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসে আজও বিরল।
অনেকে বলেন, জগৎজ্যোতি দাস বাংলার যীশু—
যেভাবে যীশুকে জনসমক্ষে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, তেমনি জগৎজ্যোতিকেও জনসমক্ষে খুঁটির সাথে পেরেক মেরে নির্যাতন করা হয়।
এমনকি সেই নির্মমতার ছবি তুলেও রেখেছিল রাজাকাররা— কারণ তিনি ছিলেন জগৎজ্যোতি দাস।
১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্ম তাঁর। পিতা জিতেন্দ্র চন্দ্র দাস, মাতা হরিমতি দাস। ছোটবেলায় সবার কাছে তিনি ছিলেন শুধু “জগৎ”।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে ১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক পাস করেন।
পরে আসামে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন, এবং দেশমাতৃকার টানে ফিরে আসেন স্বাধীনতার সংগ্রামে।
১৯৭১ সালে শিলংয়ে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি গড়ে তোলেন কিংবদন্তি ‘দাসপার্টি’।
তাঁর নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চল হয়ে ওঠে হানাদারদের জন্য এক আতঙ্কের নাম।
দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, তাহিরপুরসহ বিস্তীর্ণ জলাঞ্চলে তাঁর বাহিনী শত্রুদের নৌপথ প্রায় অচল করে দেয়।
দাসপার্টির আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তান সরকার রেডিওতে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়—
“এই রুটে চলাচলকারীদের জানমালের দায় সরকার নেবে না।”
মাত্র ১৩ জন সহযোদ্ধা নিয়ে ২৫০ সৈন্যের পাকবাহিনীকে পরাস্ত করা,
১০–১২ জন নিয়ে শ্রীপুর শত্রুমুক্ত করা—
এ যেন রূপকথাকেও হার মানানো বাস্তব ইতিহাস।
শেষ যাত্রা ছিল ১৬ নভেম্বর। ৪২ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে বাহুবল অভিযানে যাওয়ার পথে বদলপুরে শত্রুর পাতা ফাঁদে পড়ে যান তিনি।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিওতে।
তাঁর অসীম সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ ঘোষণাও করেছিল।
কিন্তু—
১৯৭২ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ‘বীরবিক্রম’ খেতাব।
প্রশ্ন থেকে যায়— কেন সেই ঘোষিত সর্বোচ্চ সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ আর দেওয়া হলো না?
আকাশবাণী কলকাতা একসময় জানিয়েছিল—
বাংলাদেশ রাষ্ট্র তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করবে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও তাঁর নামের আগে উচ্চারিত হয়েছিল “বীরশ্রেষ্ঠ”।
কিন্তু পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সেই কথা রাখেনি।
ইতিহাস কখনো কখনো নিজের ভুল সংশোধন করে—
গ্যালিলিওর ক্ষেত্রে যেমন হয়েছিল শত শত বছর পরে,
ঠিক তেমনি একদিন হয়তো বাংলাদেশও তার এই অপূর্ণতা পূরণ করবে।
সেদিন—
খেতাববিহীন এই বীর ফিরে পাবেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান।
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর গভীর ঋণস্বীকার—
ভাটির বীর জগৎজ্যোতি দাসের প্রতি।