খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক ঝটিকা অভিযানে ৩০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আশরাফুজ্জামান ওরফে লিটু (৪২) নামের এক পেশাদার মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার (২৬ এপ্রিল) বিকেলের দিকে উপজেলার আতাদি নামক স্থানে একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত লিটু সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ের বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ডিএনসি কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, কক্সবাজার থেকে ইয়াবার একটি বড় চালান নিয়ে এক ব্যক্তি যাত্রীবাহী বাসে করে সাতক্ষীরার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভাঙ্গা উপজেলার আতাদি এলাকায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে একটি অস্থায়ী তল্লাশি চৌকি স্থাপন করা হয়।
সন্দেহভাজন বাসটি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে ডিএনসি সদস্যরা তাতে তল্লাশি চালান। এ সময় আশরাফুজ্জামান লিটুর আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তার সাথে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিকালে ব্যাগটির ভেতর থেকে বিশেষ কায়দায় লুকানো ৩০ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লিটু স্বীকার করেছেন যে, তিনি এই ইয়াবাগুলো কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করে সাতক্ষীরায় সরবরাহের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
পদ্মা সেতু এবং ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে চালুর পর থেকে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তবে যোগাযোগ সহজ হওয়ার সুযোগ নিয়ে মাদক পাচারকারী চক্রগুলো এই রুটটিকে তাদের নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভাঙ্গা এখন মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট পয়েন্টে’ পরিণত হয়েছে। এখান থেকেই বিভিন্ন জেলার যানবাহন ও রুটগুলো বিভক্ত হয়, যা পাচারকারীদের জন্য গন্তব্য পরিবর্তনে সহায়ক হয়।
ডিএনসি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে এক্সপ্রেসওয়ে ও এর সংলগ্ন এলাকায় একাধিক সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ বেশ কয়েকজন বড় মাপের কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ এবং গ্রেপ্তারের ধরন বিশ্লেষণ করে কর্মকর্তাদের ধারণা, লিটু একটি আন্তর্জাতিক বা আন্তঃজেলা বড় মাদক সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। কক্সবাজার থেকে দেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে ইয়াবা সরবরাহের যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, লিটু সেই শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমান সময়ে মাদক পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে নিত্যনতুন ও আধুনিক কৌশল অবলম্বন করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাচারকারীরা এখন সরাসরি মাদক বহন না করে মোবাইল অ্যাপ ও এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করছে। এছাড়া ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সিম কার্ড সংগ্রহ এবং যাত্রীবাহী গণপরিবহনে সাধারণ পর্যটক বা যাত্রীর ছদ্মবেশে মাদক বহন করার প্রবণতা বেড়েছে। গ্রেপ্তারকৃত লিটুও সাধারণ যাত্রীবাহী বাসের সুযোগ নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা পাচারের চেষ্টা করছিলেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শিরিন আক্তার এই অভিযানের বিষয়ে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে এখন মাদক চোরাচালানের একটি রুট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। এই অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিতে ডিএনসি নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদার করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তারকৃত মাদক কারবারির বিরুদ্ধে ভাঙ্গা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সোমবার তাকে ফরিদপুরের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হবে। এই চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
ইয়াবার মতো ভয়াবহ মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে ফরিদপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলের সচেতন নাগরিক সমাজের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই মহাসড়কটি মাদক চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় তরুণ সমাজের বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইয়াবার বিস্তার রোধে শুধুমাত্র মূল কারবারিদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রগুলোও বন্ধ করা জরুরি। মাদকের এই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পরিবার ও সমাজ কাঠামোর ওপর চরম আঘাত হানছে, যা মোকাবিলায় সমন্বিত সামাজিক আন্দোলনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সুধী সমাজ।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভাঙ্গাসহ এক্সপ্রেসওয়ের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ডগ স্কোয়াড এবং আধুনিক স্ক্যানার ব্যবহারের মাধ্যমে তল্লাশি প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এক নজরে অভিযানের তথ্য:
| বিষয় | তথ্য |
| তারিখ ও সময় | ২৬ এপ্রিল, ২০২৬; বিকেল |
| স্থান | আতাদি এলাকা, ভাঙ্গা উপজেলা, ফরিদপুর |
| উদ্ধারকৃত মাদক | ৩০,০০০ পিস ইয়াবা |
| গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি | আশরাফুজ্জামান ওরফে লিটু (৪২) |
| মূল উৎস | কক্সবাজার |
| গন্তব্য | সাতক্ষীরা |
| আইনি ব্যবস্থা | মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের |