খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়াতে আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সম্প্রতি ফক্স নিউজের ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তেহরানের প্রতি সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানান। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ওয়াশিংটন-তেহরান কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান পুনরায় আলোচনায় এসেছে।
সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন যে, দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনের চাবিকাঠি ইরানের হাতে রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, ইরান যদি বর্তমান পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে চায় কিংবা শান্তি আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী হয়, তবে তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রক্রিয়ায় সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, “তারা (ইরান) যদি কথা বলতে চায়, তবে তারা আমাদের কাছে আসতে পারে অথবা সরাসরি ফোন করতে পারে।” তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ও উচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তেহরানকে আশ্বস্ত করেন যে, আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ওয়াশিংটনের কাছে বিদ্যমান রয়েছে। তার এই বক্তব্যে কূটনীতির পথে হাঁটার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইরানের সাথে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, যদি কোনো ধরনের সরাসরি যুদ্ধ বা সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং খুব দ্রুত শেষ হবে। সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান অপেক্ষা বহুগুণ শক্তিশালী দাবি করে তিনি বলেন, “এই সম্ভাব্য যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই জয়ী হবে।”
তবে ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক মহড়া এবং বাগযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। ট্রাম্প একদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন, অন্যদিকে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আল-জাজিরার প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে ইরানের সাথে করা ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে।
পরমাণু চুক্তি ও নিষেধাজ্ঞা: যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাত মারাত্মক সংকটে পড়ে।
আঞ্চলিক প্রভাব: সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখে আসছে ওয়াশিংটন।
ড্রোন ও ট্যাঙ্কার সংকট: পারস্য উপসাগরে তেলের ট্যাঙ্কারে হামলা এবং মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান আলোচনার প্রস্তাবকে অনেকে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। যেখানে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের পর এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইতিপূর্বে ঘোষণা করেছিলেন যে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সাথে সরাসরি কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। তেহরানের দাবি, আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসতে হবে এবং সকল অন্যায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), চীন এবং রাশিয়ার মতো পরমাণু চুক্তির অন্যান্য অংশীদার দেশগুলো সবসময়ই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তারা মনে করে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয় এবং এতে করে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।