খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অর্থ ব্যয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সময়কালে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ, রাতভর সাক্ষাৎকার কার্যক্রম এবং আপ্যায়ন ও নাশতার নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঘটনা ঘটে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জানুয়ারি এক সপ্তাহ সময় দিয়ে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ব্যবস্থাপক, উপপরিচালক, কিউরেটর, উপকিউরেটরসহ অন্তত ৯৬টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আবেদন গ্রহণের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে অভিযোগ রয়েছে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই ২৬ জানুয়ারি থেকে মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়।
২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তন ও সিনেমা কমপ্লেক্সে এই মৌখিক পরীক্ষা পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট সময়সীমায় প্রতিদিন বিকাল পাঁচটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত কার্যক্রম চলে বলে জানা যায়। এ সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাতীয় জাদুঘরের কর্মী নাজু মণ্ডল জানান, নির্ধারিত সময়ের পরও প্রতিদিন বহু প্রার্থী সেখানে আসতেন এবং তাদের কাগজপত্র যাচাই করা হতো। একই সময়ে প্রার্থী মো. ফারুক জানান, তিনি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন, যদিও তখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মৌখিক পরীক্ষার পর পুনরায় আবেদন করতে বলা হয়।
অপর এক প্রার্থী অভিযোগ করেন, নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য তার কাছে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছিল। তিনি জানান, জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন সহকারী সুমন মিয়া তাকে অর্থের বিষয়ে অবহিত করেন। তবে এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে নিয়োগের সংখ্যা তিন থেকে চারশর মধ্যে পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে একশর কিছু বেশি করা হয়। এই সময় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়। একই সময়ে তানজিম ইবনে ওয়াহাবকে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক এবং পরে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র অনুযায়ী, ছয় মাসে নাশতা ও আপ্যায়ন খাতে এক কোটি দুই লক্ষ টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়। এছাড়া স্বল্প সময়ে ভিআইপি আপ্যায়ন, অনুষ্ঠান আয়োজন এবং অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়।
নিচে বিভিন্ন খাতভিত্তিক ব্যয়ের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| খাত | ব্যয়ের পরিমাণ |
|---|---|
| নাশতা ও আপ্যায়ন (ছয় মাস) | ১ কোটি ২ লক্ষ টাকা |
| ভিআইপি আপ্যায়ন ও অন্যান্য (২৫ দিন) | ২৯ লক্ষ ৫৪ হাজার ৭৬০ টাকা |
| স্বেচ্ছাসেবক ব্যয় | ৫৭ লক্ষ টাকা |
| বিদেশি প্রতিনিধি আপ্যায়ন (ড. সেলিম এম আল মালিক) | ৭০ হাজার টাকা |
| সভা ও অনুষ্ঠান ব্যয় | ১০ লক্ষ ২৮ হাজার ৫১৫ টাকা |
| আলোকসজ্জা ও সংস্কার | ৩৮ লক্ষ টাকার বেশি |
| গ্যালারি সংস্কার | প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা |
| সীমানা প্রাচীর নির্মাণ | ৬৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৪৭০ টাকা |
আরও জানা যায়, মোহাম্মদপুর এলাকার আড্ডা প্রবর্তনা রেস্তোরাঁর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নাশতা ও সভার ব্যয় দেখানো হয়। রেস্তোরাঁটির দায়িত্বে থাকা মং মারমা এবং মো. শাহিন জানান, তারা সীমিত পরিসরে প্রতিদিন কয়েকজনের জন্য সাধারণ খাবার সরবরাহ করতেন এবং বড় অঙ্কের বিলের বিষয়টি তাদের জানা নেই।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব দাবি করেন, কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি এবং স্বেচ্ছাসেবক সংক্রান্ত কিছু কার্যক্রমই কেবল পরিচালিত হয়েছে। অপরদিকে জাতীয় জাদুঘরের সচিব মো. সাদেকুল ইসলাম জানান, নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যক্রম একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগ সঠিক নয়।
সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।