খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম শীর্ষ তারকা এবং জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম তাঁর দীর্ঘ পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী শুক্রবার, ১ মে ২০২৬ তারিখে বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস অ্যান্ড সোসাইটির বিপক্ষে ফর্টিস এফসির ম্যাচটির মাধ্যমে তিনি সব ধরনের ফুটবল থেকে অবসর গ্রহণ করবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে তিনি তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। ৩৭ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার তাঁর বিদায়ী ম্যাচে ভক্ত ও সমর্থকদের উপস্থিতি কামনা করেছেন।
মামুনুল ইসলাম বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী মিডফিল্ডার হিসেবে স্বীকৃত। ২০০৭ সালে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি জাতীয় দলের মাঝমাঠ আগলে রেখেছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে তিনি মোট ৫৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং ৩টি গোল করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। বিশেষ করে মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত পাসিং এবং দূরপাল্লার শটের জন্য তিনি ফুটবল বোদ্ধাদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
জাতীয় দল থেকে মাঠের লড়াইয়ের মাধ্যমে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নানা পারিপার্শ্বিক কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ম্যাচ দিয়ে মাঠ থেকেই বুটজোড়া তুলে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। মামুনুল তাঁর বিদায়ী বার্তায় লিখেছেন, “আমি মামুনুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও অধিনায়ক। দীর্ঘদিনের এই পেশাদার ফুটবল যাত্রার শেষ অধ্যায়ে এসে আগামী ১ মে ফর্টিস এফসি বনাম রহমতগঞ্জ ম্যাচের মাধ্যমে আমার ক্যারিয়ারের ইতি টানতে যাচ্ছি।”
মামুনুল ইসলামের ক্লাব ক্যারিয়ার ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। তিনি বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের প্রায় সবকটি বড় ক্লাবের হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। তাঁর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা আবাহনী লিমিটেড এবং ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। এছাড়া তিনি শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এবং শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবের হয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমান সময়ে তিনি ফর্টিস এফসির হয়ে খেলছেন, যে ক্লাবের জার্সি গায়েই তিনি তাঁর শেষ ম্যাচটি খেলবেন।
তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারের বিশেষ কিছু তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
বড় ক্লাবে অংশগ্রহণ: আবাহনী, মোহামেডান, শেখ রাসেল ও শেখ জামালের মতো ক্লাবে খেলে একাধিকবার লিগ শিরোপা ও ফেডারেশন কাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন।
নেতৃত্বের গুণাবলি: ক্লাবের হয়ে খেলার সময়ও তিনি তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন, যা তাঁকে সতীর্থদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছিল।
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে মামুনুল ইসলামের একটি অনন্য রেকর্ড রয়েছে। তিনি প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবে ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ব্যয়বহুল লিগ ‘ইন্ডিয়ান সুপার লিগ’ (আইএসএল)-এ সুযোগ পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি আইএসএল-এর অন্যতম সফল দল ‘আতলেতিকো ডি কলকাতা’তে (বর্তমানে মোহনবাগান এসজি) নাম লিখিয়েছিলেন। যদিও ইনজুরি এবং অন্যান্য কারণে সেখানে খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ তাঁর হয়নি, তবে বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের সাথে ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোচিংয়ের অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এই অর্জন দেশের তরুণ ফুটবলারদের বিদেশের লিগে খেলার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল।
আগামী ১ মে বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় মামুনুল ইসলামের বিদায়ী ম্যাচটি বাংলাদেশের ফুটবল অনুসারীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। মামুনুল তাঁর ঘোষণায় জানিয়েছেন, এই বিশেষ দিনে ভক্ত ও সমর্থকদের মাঠে উপস্থিতিই হবে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও সার্থকতা। দীর্ঘ ২০ বছরের ফুটবল যাত্রায় তিনি দেশ ও ক্লাবের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার যোগ্য সম্মান দিতেই সমর্থকরা মাঠে হাজির হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ফুটবল থেকে অবসরের পর মামুনুল ইসলামের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে দেশের ফুটবল অঙ্গনের অনেকে মনে করেন, তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি ভবিষ্যতে কোচিং বা ফুটবল ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত হয়ে দেশের ফুটবলের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন।
মামুনুল ইসলামের বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের প্রস্থান নয়, বরং বাংলাদেশের ফুটবলের একটি সমৃদ্ধ অধ্যায়ের অবসান। ১ মে’র সেই ম্যাচটি হবে একজন কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এবং তাঁর অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার দিন।