খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘ দেড় বছরের কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঢাকা ও দিল্লি। এর অংশ হিসেবে দুই দেশই তাদের পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম ফের সচল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সব ক্যাটাগরির ভিসা ইস্যু করা শুরু করেছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারতও তাদের ভিসা সেবা পুরোপুরি চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। তবে এই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় দুটি পত্রিকা অফিস এবং ছায়ানট ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে।
একই রাতে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ এবং ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে ২১ ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রামে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের (আইভ্যাক) কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ২২ ডিসেম্বর দিল্লি ও আগরতলা মিশন থেকে ভিসা এবং কনস্যুলার সেবা স্থগিত করে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল আসার আগেই ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বিবৃতিতে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। পরবর্তীতে টেলিফোনে আলাপকালে মোদি দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। যদিও পূর্বনির্ধারিত ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিটের’ কারণে মোদি বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি, তবে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। সেই সফরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করা। বর্তমানে নয়াদিল্লি, কলকাতা, আগরতলা এবং চেন্নাইসহ বাংলাদেশের সব কনস্যুলার কেন্দ্র চালু রয়েছে। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ নিশ্চিত করেছেন যে, গত বছরের ডিসেম্বরে স্থগিত হওয়া কেন্দ্রগুলো ফেব্রুয়ারিতেই পুনরায় চালু করা হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই ভারতীয় ভিসা কার্যক্রমের পূর্ণ গতি ফিরবে। নিচের টেবিলে ভিসা কার্যক্রমের বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হলো:
টেবিল: বাংলাদেশ ও ভারতের ভিসা কার্যক্রমের তুলনামূলক চিত্র
| বিষয় | বাংলাদেশ (ভারতে অবস্থিত মিশনসমূহ) | ভারত (বাংলাদেশে অবস্থিত আইভ্যাক) |
| বর্তমান স্থিতি | পুরোদমে চালু (ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে) | সীমিত/আংশিক চালু (শীঘ্রই পূর্ণাঙ্গ চালুর অপেক্ষায়) |
| ভিসা ক্যাটাগরি | সব ক্যাটাগরির ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে | বর্তমানে জরুরি ও সীমিত ক্যাটাগরি চালু |
| প্রধান কেন্দ্রসমূহ | নয়াদিল্লি, কলকাতা, আগরতলা, চেন্নাই | ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও অন্যান্য |
| কার্যকরী পদক্ষেপ | পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরের পর গতিশীলতা | নতুন হাইকমিশনার যোগদানের পর পূর্ণাঙ্গ চালুর সম্ভাবনা |
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতের পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের জন্য সব ধরনের ভিসা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ঢাকা এখন দিল্লির পক্ষ থেকে একই ধরনের দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে। দুই দেশের কূটনীতিকরা মনে করছেন, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া মানে কেবল সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়া নয়, বরং এটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি শক্তিশালী বার্তা। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দিনেশ ত্রিবেদীর কার্যভার গ্রহণের মাধ্যমে ভিসা প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।