খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গভীর বোঝাপড়াকে অপরিহার্য বলে অভিহিত করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বঢ়ে। তিনি মনে করেন, দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অভিন্নতা এই সম্পর্ককে কেবল ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। শনিবার (২ মে, ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত ‘গ্যালারি কায়া’য় আয়োজিত এক শিল্প প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পাওয়ান বঢ়ে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সহযোগিতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ (Connectivity) বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগগুলো অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। এই সফলতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় নিয়মিত সংলাপ এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক আস্থার ওপর তিনি জোর দেন।
তিনি আরও জানান, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও কার্যকর ও টেকসই করা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং শিক্ষা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে উভয় দেশ নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মনে করেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ (People-to-People contact) বৃদ্ধিতে সাংস্কৃতিক বিনিময় একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং শৈল্পিক আদান-প্রদান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি আরও মজবুত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, ভারত এই অগ্রগতির যাত্রায় বাংলাদেশের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুই দেশের মানুষের আন্তসম্পর্ক, অভিন্ন ইতিহাস এবং সংস্কৃতির গভীরতা এই বন্ধনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এদিন গ্যালারি কায়ায় বিশিষ্ট শিল্পী রনজিৎ দাসের ‘কাঠি ড্রয়িংস অ্যান্ড আদার্স’ শীর্ষক একক শিল্প প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। সমসাময়িক শিল্পচর্চায় নতুন মাত্রা যুক্ত করতে এই প্রদর্শনীতে শিল্পীর মোট ৬৫টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। জলরং, মিশ্র মাধ্যম, কালি এবং চারকোলের সমন্বয়ে আঁকা এসব ছবির পাশাপাশি প্রদর্শনীতে রয়েছে ২৯টি ছবির ‘ফোলিং’ নামক একটি বিশেষ পোর্টফোলিও।
প্রদর্শনীটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই আয়োজনটি কেবল শিল্পকর্ম প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি শিল্পী ও শিল্পানুরাগীদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের একটি কার্যকর মঞ্চ। দেশের শিল্পচর্চাকে সমৃদ্ধ করতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী রনজিৎ দাসের অঙ্কনশৈলী সম্পর্কে বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “রনজিৎ দাসের কাজের ধারাটি অত্যন্ত স্বতন্ত্র। তিনি সরল রেখা ও ক্যানভাসের ফাঁকা স্থানকে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যা গভীর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। অনেক ক্ষেত্রে একটিমাত্র তুলির আঁচড়ই বিশাল শূন্যতাকে অর্থবহ করে তোলে।” সমকালীন বাংলাদেশের শিল্পজগতে রনজিৎ দাসের শক্তিশালী উপস্থিতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিল্পী রনজিৎ দাস তাঁর কাজের অনুপ্রেরণা নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ এবং বিশেষ করে পাহাড় ও প্রকৃতির সংস্পর্শ তাঁর শিল্পসত্ত্বাকে সমৃদ্ধ করেছে। দীর্ঘদিনের সেই অভিজ্ঞতা এবং প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যই তাঁর ক্যানভাসে শৈল্পিক রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।
উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত গ্যালারি কায়ায় শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শিল্পানুরাগী ও সাধারণ দর্শনার্থীরা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রদর্শনীটি পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন।
পরিশেষে, ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারের এই বক্তব্য এবং রনজিৎ দাসের শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন—উভয়ই প্রমাণ করে যে, রাজনীতি ও অর্থনীতির পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতিও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। দুই দেশের এই বহুমাত্রিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুসংহত হবে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আশা প্রকাশ করছে।