খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
ফরিদপুরের নগরকান্দায় একটি সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জেরে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৫)। গত শুক্রবার (১ মে, ২০২৬) দিবাগত রাতে উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া নতুন হাটখোলা এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। এই মৃত্যুর ফলে হান্নান শেখের দুই বছর বয়সী কন্যাসন্তান মুসলিমা ইসলাম সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। শিশুটির মা জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ায় এবং এখন বাবার অকাল মৃত্যুতে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রাক যাওয়ার সময় কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়দের মধ্যে এই মর্মে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, “ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে”। এই বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং উত্তেজিত জনতা রাস্তা অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়।
এরপর ট্রাকের ভেতর থেকে চালক হান্নান শেখকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। স্থানীয়দের প্রচণ্ড পিটুনিতে হান্নান শেখ গুরুতর আহত হন। পুলিশ সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় চালকের সাথে থাকা দুই সহকারী নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত হান্নান শেখের বাড়ি বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের বাসিন্দা শহিদ শেখের ছেলে। হান্নান শেখের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মুসলিমার জন্মের মাত্র তিন সপ্তাহ পর তার মা আরিফা বেগম পারিবারিক কলহের জেরে হান্নান শেখকে তালাক দিয়ে চলে যান। এরপর থেকে বৃদ্ধ দাদা শহিদ শেখ ও দাদি নার্গিস বেগমই শিশুটিকে অতি কষ্টে লালন-পালন করে আসছিলেন।
বর্তমানে হান্নান শেখের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও দুই বছরের শিশু মুসলিমা এখনো বুঝতে পারছে না সে তার জীবনের একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়েছে। দাদির কোলে বসে ফিডারের দুধ খাচ্ছে শিশুটি, আবার চারপাশে মানুষের ভিড় ও কান্নাকাটি দেখে হঠাৎ আঁতকে উঠে কেঁদে ফেলছে।
মুসলিমার দাদি নার্গিস বেগম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জানান:
“জন্মের ২১ দিন বয়সে মা ফেলে গেছে, এখন ওর বাপও নেই। আমার মুসলিমার আর কেউ রইল না। আমরা বুড়ো মানুষ, আজ আছি কাল নেই। আমি মরে গেলে এই বাচ্চার দেখভাল কে করবে?”
শিশুটির দাদা শহিদ শেখ বলেন যে, হান্নানই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। গুজব ছড়িয়ে তাকে হত্যার মাধ্যমে একটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি তার ছেলে কোনো অপরাধ করে থাকত তবে কেন তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হলো না?
ঘটনার পর নিহত হান্নান শেখের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রসুল সামদানী আজাদ জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। তিনি বলেন:
“আমরা নিহতের পরিবারকে হত্যা মামলা দায়ের করার পরামর্শ দিয়েছি। পরিবার জানিয়েছে যে, দাফন কাজ সম্পন্ন করার পর তারা মামলা দায়ের করবেন।”
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারা গুজব ছড়িয়েছে এবং জনতাকে উসকে দিয়েছে, তাদের শনাক্ত করতে ডিজিটাল ফুটেজ এবং তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান নিশ্চিত করেছেন যে, মামলা দায়েরের পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।