খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে বন্য হাতির পালের তাণ্ডবে চরম উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে এসে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষকেরা অনেকটা বাধ্য হয়েই আধাপাকা ও কাঁচা ধান কাটতে শুরু করেছেন। হাতির পালের ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটানো কৃষকেরা মাঠের ফসল নিয়ে এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
ঝিনাইগাতী উপজেলার গন্দিগাঁও গ্রামের রাজিব কোচ (৪৮) পেশায় একজন অটোরিকশাচালক। পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটাতে তিনি গজনী পাহাড়ের ঢালে ৬০ শতক জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ফসল পরিপুষ্ট হতে আরও প্রায় ২০ দিন সময় লাগলেও হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনি আগাম ধান কেটে নিচ্ছেন। একই গ্রামের কৃষক লাল কৃষ্ণ কোচ জানান, দুই রাতের ব্যবধানে হাতির পাল তার এক একর জমির ধান খেয়ে ও মাড়িয়ে নষ্ট করে দিয়েছে। বর্তমানে তিনি ক্ষতিপূরণের আশায় বন বিভাগে আবেদন করেছেন। শুধু রাজিব বা লাল কৃষ্ণ নন, গজনী গ্রামের অজন্তা সাংমা কিংবা সমশ্চূড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার মতো শত শত কৃষক এখন একই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
বন বিভাগ ও স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৪০ থেকে ৪৫টি বন্য হাতির একটি দল ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে অবস্থান করছে। এই দলে অন্তত ১৫টি হাতির শাবক রয়েছে। গত এক সপ্তাহে হাতির এই দলটি ঝিনাইগাতীর গজনী, গন্দিগাঁও ও বাঁকাকুড়া এলাকার প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন কৃষকের ৫ একর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট করেছে।
গজনী বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ এবং সমশ্চূড়া বিট কর্মকর্তা মো. কাওসার জানান, হাতির দলটি বর্তমানে সমশ্চূড়া ও বাতকুচি জঙ্গলে অবস্থান করছে। হাতির পাল যেন লোকালয়ে ঢুকে জানমালের ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য বন বিভাগের পাশাপাশি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ERT) এবং স্থানীয় গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। ময়মনসিংহ বন বিভাগের গজনী বিটের কর্মকর্তা মো. তোহিদুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে বলা হয়েছে।
শেরপুরের তিনটি সীমান্তবর্তী উপজেলায় এবার বিপুল পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। নিচে সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর আবাদি জমির পরিমাণ এবং বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: শেরপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় বোরো চাষের পরিসংখ্যান
| উপজেলার নাম | বোরো আবাদের পরিমাণ (হেক্টর) | বর্তমান অবস্থা ও ঝুঁকি |
| শ্রীবরদী | ৪,৫০১ হেক্টর | উচ্চ সতর্কাবস্থা |
| ঝিনাইগাতী | ২,২৪০ হেক্টর | হাতির তাণ্ডবে ফসলের ক্ষতি হয়েছে |
| নালিতাবাড়ী | ২,১১৬ হেক্টর | বর্তমানে হাতির পালটি এখানে অবস্থান করছে |
| মোট | ৮,৮৫৭ হেক্টর | সাফল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা |
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, ধান পরিপুষ্ট হওয়ার আগে কেটে ফেললে ধানের ওজন কমে যায় এবং চালের গুণগত মান নষ্ট হয়। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অধিকাংশ জমির ধান পাকতে এখনও দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। কিন্তু বালিজুড়ি, খাড়ামুড়া, তাওয়াকুচা, গজনী, রাংটিয়া, সমশ্চূড়া, মধুটিলা ও বারমারি গ্রামের কৃষকেরা ফসলের মায়া ছেড়ে জীবন ও অবশিষ্ট সম্পদ রক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
পাহাড়ি জনপদে হাতির সঙ্গে মানুষের এই দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। তবে ধান কাটার এই মৌসুমে হাতির শাবকসহ বড় দলটির লোকালয়ের কাছাকাছি অবস্থান কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। বন বিভাগ হাতির নিরাপত্তা ও কৃষকের ফসল রক্ষার দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। দ্রুত পদক্ষেপ ও সঠিক পর্যবেক্ষণই কেবল সীমান্ত এলাকার এই সংকট লাঘব করতে পারে।