খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় একটি বসতবাড়িতে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় লামিয়া আক্তার শশী (১৪) নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। রোববার (৩ মে) বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়নের দুর্গম সোনার তাইড় গ্রামে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত লামিয়া ওই গ্রামের বাসিন্দা সবুজ মণ্ডলের কন্যা এবং স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
গাবতলী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে তারা সোনার তাইড় গ্রামের একটি টিনশেড বাড়িতে আগুন লাগার সংবাদ প্রাপ্ত হন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ধারণা, সংবাদ পাওয়ার অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট পূর্বে অর্থাৎ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণের ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিস জানায়, অগ্নিকাণ্ডের উৎস ছিল ঘরের ভেতরে থাকা একটি বৈদ্যুতিক সেলাই মেশিন। ধারণা করা হচ্ছে, সেলাই মেশিনটি সচল থাকা অবস্থায় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ঘটে এবং সেখান থেকে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ে। ঘরের পাশেই রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলা থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ পাওয়ার পরপরই গাবতলী ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তবে সোনার তাইড় গ্রামটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এবং ওই এলাকার সংযোগ সড়কগুলোর অবস্থা জীর্ণ ও বেহাল হওয়ার কারণে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর গাড়ি পৌঁছাতে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হয়। ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার নাসিম ইকবাল জানান, রাস্তার প্রতিবন্ধকতার কারণে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ততক্ষণে আগুনের তীব্রতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, কিশোরী লামিয়া ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাননি। প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েও আগুনের লেলিহান শিখার কারণে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ঘরের ভেতর থেকে লামিয়ার দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেন।
অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনায় সবুজ মণ্ডলের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, আগুনে বাড়ির দুটি বড় শয়নকক্ষ, একটি রান্নাঘর এবং একটি গোয়ালঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। ঘরের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ যাবতীয় সামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিতে গিয়ে এক ব্যক্তি সামান্য বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন। লামিয়া ছাড়া এই ঘটনায় অন্য কোনো প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া যায়নি।
আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নিহত কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় থানা পুলিশের উপস্থিতিতে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গাবতলী থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে যৌথভাবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
এই দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে সেলাই মেশিন, ইস্ত্রি বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের পর সেগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা এবং রান্নার পর গ্যাসের চুলা সঠিকভাবে বন্ধ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া সরু ও বেহাল গ্রামীণ রাস্তাগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও এই দুর্ঘটনার মাধ্যমে পুনরায় সামনে এসেছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কাজে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
কিশোরী শিক্ষার্থীর এমন অকাল মৃত্যুতে সোনার তাইড় গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত লামিয়ার বিদ্যালয়ের সহপাঠী ও শিক্ষকরা এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। মৃতদেহ হস্তান্তরের পর রাতেই স্থানীয় কবরস্থানে তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।