খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় নেশার টাকার জন্য গর্ভধারিণী মায়ের ওপর হামলা ও ছুরিকাঘাতের ঘটনায় গুরুতর আহত সাজেদা বেগম (৫৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। শুক্রবার (১ মে) বিকেলে উপজেলার পশ্চিমপাড়া মহল্লায় সংঘটিত এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দুই দিন ধরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে রবিবার (৩ মে) সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলে রাজনকে ঘটনার দিনই গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অভিযুক্ত রাজন দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন এবং নেশার টাকার জন্য প্রায়ই পরিবারের সদস্যদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতেন। শুক্রবার বিকেলে রাজন তার মা সাজেদা বেগমের কাছে নেশার দ্রব্য ক্রয়ের জন্য ৫০০ টাকা দাবি করেন। সংসার পরিচালনার টানাপোড়েন এবং ছেলের নেশার প্রতি আসক্তি দেখে মা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে রাজন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাজন ঘর থেকে একটি ধারালো ছুরি নিয়ে এসে তার মায়ের পেটে সজোরে আঘাত করেন। ছুরিকাঘাতে সাজেদা বেগমের পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসলে রাজন ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা সাজেদা বেগমকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তির পর চিকিৎসকরা তার অস্ত্রোপচার করেন এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পেটের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই দিনের চিকিৎসা শেষে রবিবার সন্ধ্যায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের নিকট মৃতদেহ হস্তান্তর করা হবে।
ঘটনার পরপরই বড়াইগ্রাম থানা পুলিশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের সহায়তায় অভিযুক্ত রাজনকে দ্রুত আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ। বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, পুলিশ সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজনের মাদকাসক্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। ইতিপূর্বে মায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনায় থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভুক্তভোগীর মৃত্যু হওয়ায় মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। পুলিশ এই ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং অপরাধের মোটিভ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমপাড়া মহল্লার বাসিন্দারা জানান, মাদকাসক্তির কারণে একটি সাজানো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা এবং যুবসমাজের বিপথগামিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত রাজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
বড়াইগ্রাম থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত রাজন বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর এবং মামলার আনুষঙ্গিক তথ্য সংগ্রহের পর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। নিহতের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে।
মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডটি সমাজে মাদকের ভয়াবহ পরিণতির এক করুণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঘাতক ছেলের হাতে মায়ের এমন অকাল মৃত্যুতে নিহতের আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশি তদন্ত শেষে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করার আশ্বাস দিয়েছে বড়াইগ্রাম থানা প্রশাসন।