খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষ নেতাদের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর মঙ্গলবারের জন্য পরিকল্পিত একটি নতুন হামলা স্থগিত করেছে তার প্রশাসন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, বর্তমানে তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেন, তাকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো থেকে জানানো হয়েছে যে একটি নতুন সমঝোতা সম্পন্ন হতে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘খুবই গ্রহণযোগ্য’ একটি বিষয় হবে। এই আলোচনার অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে আরও যোগ করেন, ‘ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’ তবে এই ইতিবাচক বার্তার পাশাপাশি তিনি তেহরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘যেকোনো মুহূর্তে’ ইরানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরের সামরিক হামলা চালাতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি ওয়াশিংটনকে কোনো ধরনের ‘কৌশলগত ভুল ও ভুল হিসাব’ না করার জন্য কড়া আহ্বান জানান। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার এই প্রক্রিয়াকে একটি ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করলেও কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, তা দেখার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। অতীতেও কয়েকবার সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ মুহূর্তে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার নজির রয়েছে তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তবে এবারের পরিস্থিতি ‘কিছুটা ভিন্ন’ বলে মনে হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘ইরানের সঙ্গে সমঝোতার একটি খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। যদি বোমাবর্ষণ বা সামরিক পদক্ষেপ ছাড়াই এই সমস্যার সমাধান করা যায়, তবে আমি খুবই খুশি হব।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান উত্তেজনা এক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করে। এর পাল্টা জবাবে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের কারণে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মূল আশঙ্কা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর পুনরায় নতুন কোনো হামলা চালায়, তবে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা এবং লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সংঘাতের তীব্রতা হ্রাস ও আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির সুবিধার্থে গত এপ্রিল মাসে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়। যদিও মাঝেমধ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা ঘটেছে, তথাপি সামগ্রিকভাবে এই যুদ্ধবিরতিটি এখনো পর্যন্ত মোটামুটি বহাল রয়েছে।
চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালির’ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়েই বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করে।
ইরানের এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে এবং বর্তমান যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে দেশটির সবকটি প্রধান বন্দর কঠোরভাবে অবরোধ করে রেখেছে মার্কিন নৌবাহিনী।
এই অবরোধ ও সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘তাসনিম’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানে যদি নতুন করে কোনো সামরিক হামলা চালানো হয়, তবে এমন একটি নতুন যুদ্ধের ফ্রন্ট বা রণক্ষেত্র উন্মোচন করা হবে, যেখানে প্রতিপক্ষের সামরিক অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কম এবং তাদের দুর্বলতা অনেক বেশি। এর আগে গত রোববার ট্রাম্পও ইরানকে আলটিমেটাম দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব তারা পাঠিয়েছে এবং বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই আলোচনায় তেহরানের মূল দাবিগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনও তাদের নিজস্ব শর্তে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে।
নিচে দুই পক্ষের মূল দাবি ও শর্তাবলির একটি তুলনামূলক বিবরণ উপস্থাপন করা হলো:
| পক্ষ | প্রধান দাবি ও শর্তাবলি |
| ইরান |
* মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি ফ্রন্টে অনতিবিলম্বে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। * ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। * ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কোনো সামরিক হামলা চালানো হবে না—এমন আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা দিতে হবে। * চলমান সংঘাত ও হামলার কারণে সৃষ্ট যুদ্ধক্ষতির জন্য ইরানকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। |
| যুক্তরাষ্ট্র |
* ইরানের সামগ্রিক পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে মাত্র একটি পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হবে। * ইরানের কাছে বর্তমানে মজুত থাকা সমস্ত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। * (বিকল্প প্রস্তাব) ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘ ২০ বছরের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে রাজি হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। |
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো অনবরত অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে মূলত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে তেহরান পশ্চিমাদের এই অভিযোগ শুরু থেকেই বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক ও বেসামরিক প্রয়োজনে পরিচালিত হচ্ছে।