খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের মোট ১৪১ জন শিক্ষকের নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই ভুয়া শিক্ষকেরা অনার্স পাসের জাল সনদ, ভুয়া নিয়োগ বোর্ড, ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) জাল সনদ ব্যবহার করে এই প্রতারণা করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
ডিআইএর পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির নিয়োগ জালিয়াতি ও ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তদন্তাধীন প্রতিষ্ঠান দুটির মোট শিক্ষক সংখ্যা, অবৈধ নিয়োগের পরিমাণ এবং আর্থিক অনিয়মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচের টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:
| প্রতিষ্ঠানের নাম | মোট শিক্ষক সংখ্যা | অবৈধ/ভুয়া শিক্ষক সংখ্যা | আর্থিক অনিয়ম ও আত্মসাতের বিবরণ |
| সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (ঢাকা) | ১৩৩ জন | ৬৮ জন | অবৈধ বেতন-ভাতা, কেনাকাটায় অনিয়ম ও হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১৫ কোটি টাকা লুটপাট। |
| বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ (ময়মনসিংহ) | ৭৬ জন | ৭৩ জন | ভুয়া নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি কোষাগারের ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ। |
রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এর সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিধিহির্ভূতভাবে দ্বিগুণ হারে উৎসব ভাতা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে সাহাব উদ্দিন মোল্লা বেসরকারি বেতন বাবদ অবৈধভাবে ৯৭ লাখ টাকা এবং দেলুয়ার হোসেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা নিয়েছেন, যা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য। এছাড়া দেলুয়ার হোসেনের মূল নিয়োগটি বিধিসম্মত না হওয়ায় তাঁর নেওয়া আরও প্রায় ৩৮ লাখ টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দেওয়া ২ কোটি ৩২ লাখ টাকাও ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিনিয়োগেও বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে ডিআইএ। বিধিসম্মতভাবে কোনো তপশিলি ব্যাংকে এফডিআর (FDR) না করে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ৭ কোটি ৮৮ লাখ ৩৭ হাজার ৪০৫ টাকা জমা রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ফার্স্ট ফিন্যান্স লিজিং কোম্পানিতে ৫ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৬ টাকা, পিপলস লিজিং কোম্পানিতে ২ কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ৪৯ টাকা এবং জিএসপি ফিন্যান্স কোম্পানিতে ৪ লাখ টাকা রাখা হয়।
এছাড়া জেনারেটর, লিফট ও ল্যাপটপ কেনা, বিভিন্ন মেরামতকাজ এবং অভিভাবক শেড নির্মাণেও বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে। প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচটি ল্যাপটপ কেনা হলেও বাস্তবে মাত্র দুটি পাওয়া গেছে। ক্যান্টিনের মাসিক ভাড়ার কোনো আর্থিক তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার নামে তহবিল থেকে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সাবেক সভাপতির ছেলে শেখ এমরানুল আলম ২০২৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ না করেই প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করেছেন। কোচিং ক্লাসের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের কোনো রসিদ বা ব্যয়ের রেকর্ডও ডিআইএর পরিদর্শক দলকে দেখানো হয়নি।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের জালিয়াতির ঘটনা আরও নজিরবিহীন। এই প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখার ৬১ জন শিক্ষকের সবাই এবং স্কুল শাখার ১২ জন শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধ। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকের নিজের সব সনদই জাল। তিনি শিক্ষক নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করতেন এবং নিয়োগ পাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের বেতন-ভাতার একটি অংশ নিজে কেটে রাখতেন।
অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক তাঁর নিজের পরিবারের ১১ জন সদস্য ও আত্মীয়কে জাল সনদের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন:
স্ত্রী: ইসমেতারা (অফিস সহায়ক)
ছেলে ও পুত্রবধূ: ইমরুল হাসান কায়েস ও সুস্মিতা আক্তার জেরিন (উভয়েই ল্যাব সহকারী)
মেয়ে: ইসরাত জাহান (ল্যাব সহকারী)
বোন ও ভগ্নিপতি: আসমা খাতুন (সহকারী শিক্ষক, কৃষিশিক্ষা) এবং আজিজুল হক (প্রভাষক, বাণিজ্য)
শ্যালকের স্ত্রী: শেফালি খাতুন (প্রভাষক)
চাচাতো ভাই ও বোন: কামরুল ইসলাম (প্রভাষক, ব্যাংকিং) এবং শাহনাজ পারভীন (প্রভাষক)
ব্যক্তিগত গাড়িচালক
এই ভুয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ উত্তোলিত সরকারি কোষাগারের ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ফেরত আনার সুপারিশ করেছে ডিআইএ। একই সঙ্গে অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়েরের জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সারাদেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত করেছে ডিআইএ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে। এসব জাল সনদধারী শিক্ষকেরা এ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি তহবিল থেকে মোট ৩৭৫ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন, যা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, চিহ্নিত হওয়া অংশটি অত্যন্ত সীমিত এবং এর পেছনে আরও অনেক জাল সনদধারী থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি শুধু জাল সনদধারীদের নয়, বরং এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং যারা এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ এই পরিস্থিতির জন্য নিয়োগের সময় সনদ যাচাই না করার অবহেলা এবং বাহ্যিক দুর্নীতি চক্রকে দায়ী করেছেন। তিনি যোগদানের পূর্বেই সনদ যাচাই করার ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।