খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নিজের দুটি শিশুসন্তানকে পাচারের উদ্দেশ্যে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করার চেষ্টার অভিযোগে এক বাবাসহ মানব পাচার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অভিযানকালে অপহৃত দুই শিশুকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—শিশুদের বাবা মেজবাহ উদ্দিন, মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য এমদাদুল হক রাব্বানী (২৩) এবং নুর-ই-নাসরিন (২৯)। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে শিশুদের বাবা মেজবাহ উদ্দিন ইতোমধ্যে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ গণমাধ্যমকে এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহার ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, সাত বছর আগে ঝর্ণা আক্তারের সঙ্গে মেজবাহ উদ্দিনের বিয়ে হয়। উদ্ধার হওয়া পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আরিয়ান এবং মাত্র ২৮ দিন বয়সী ছেলে আব্দুর রহমান জুবায়েত এই দম্পতির সন্তান। তারা সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মিজমিজি বুকস গার্ডেন এলাকার বাসিন্দা।
বিয়ের পর থেকেই মেজবাহ উদ্দিন বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যার ফলে তাদের সংসারে অনবরত অশান্তি লেগে থাকত। পারিবারিক কলহের জেরে মেজবাহ প্রায়শই তার স্ত্রীর কাছে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করতেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা ব্যর্থ হলে সন্তানদের বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দিতেন তিনি।
পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মেজবাহ উদ্দিন মূলত মাদকাসক্ত এবং অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি একাধিক বিয়েও করেছেন। জুয়া ও মাদকের বিপুল অর্থের জোগান দিতেই তিনি নিজের সন্তানদের অর্থের বিনিময়ে বিক্রির এই অমানবিক পরিকল্পনা করেন।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২১ এপ্রিল পূর্বপরিচিত মানব পাচারকারী এমদাদুল হক রাব্বানীর সহায়তায় মেজবাহ উদ্দিন তার দুই সন্তানকে বাসা থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। সন্তানদের খুঁজে না পেয়ে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরে যে তাদের পাচারের উদ্দেশ্যে বিক্রির পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সন্তানদের মা ঝর্ণা আক্তার চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় ধরে আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করার পরও সন্তানদের কোনো সন্ধান না পেয়ে, অবশেষে গত ১৩ মে তিনি বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা দায়েরের পর মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই। পিবিআইয়ের একটি বিশেষ দল তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে।
প্রথম অভিযান (১৩ মে রাত): পিবিআই দল ঢাকার সাভারের আড়াপাড়া এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ বছর বয়সী বড় ছেলে আরিয়ানকে উদ্ধার করে। এই স্থান থেকেই শিশুদের বাবা মেজবাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযান (সোমবার গভীর রাত): মেজবাহ উদ্দিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বনানী কড়াইল বস্তি-সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য এমদাদুল হক রাব্বানীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তৃতীয় অভিযান (একই রাতে পরবর্তী অংশ): গ্রেপ্তারকৃত রাব্বানীর স্বীকারোক্তি ও দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পল্লবী এলাকায় দ্রুত অভিযান চালায় পিবিআই। সেখান থেকে চক্রের অপর নারী সদস্য নুর-ই-নাসরিনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার হেফাজত থেকে ২৮ দিন বয়সী শিশু আব্দুর রহমান জুবায়েতকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তারকৃত এমদাদুল হক রাব্বানী একটি সুসংগঠিত ও সক্রিয় মানব পাচার চক্রের সদস্য। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন পন্থায় দেশের দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলোকে টার্গেট করে শিশু সংগ্রহ এবং পাচার করতেন। তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক শিশু পাচারের সাথে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পিবিআই।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের আদালতে হাজির করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হলে, বিজ্ঞ আদালত এমদাদুল হক রাব্বানীর পাঁচ দিন এবং নুর-ই-নাসরিনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নিচে এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত, উদ্ধারকৃত শিশু এবং আদালতের আদেশের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী দেওয়া হলো:
| ক্যাটাগরি | সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম ও বয়স | সম্পর্কের বিবরণ / ভূমিকা | উদ্ধারস্থল / আইনি বর্তমান অবস্থা |
| উদ্ধারকৃত শিশু ১ | আরিয়ান (৫ বছর) | মেজবাহ ও ঝর্ণা দম্পতির বড় ছেলে | সাভারের আড়াপাড়া থেকে উদ্ধার |
| উদ্ধারকৃত শিশু ২ | আব্দুর রহমান জুবায়েত (২৮ দিন) | মেজবাহ ও ঝর্ণা দম্পতির ছোট ছেলে | পল্লবী এলাকা থেকে উদ্ধার |
| গ্রেপ্তারকৃত আসামি ১ | মেজবাহ উদ্দিন | শিশুদের বাবা ও মূল পরিকল্পনাকারী | আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান |
| গ্রেপ্তারকৃত আসামি ২ | এমদাদুল হক রাব্বানী (২৩) | মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য | আদালত কর্তৃক ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর |
| গ্রেপ্তারকৃত আসামি ৩ | নুর-ই-নাসরিন (২৯) | মানব পাচার চক্রের নারী সদস্য | আদালত কর্তৃক ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর |