খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
সৌদি আরবের ভিন্ন ভিন্ন দুটি অঞ্চলে সংঘটিত পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় তিন বাংলাদেশি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর হামছাদী এলাকার বাসিন্দা এবং অন্যজন ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার অন্তর্গত এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। রোববার (৩১ মে) এবং সোমবার (১ জুন) পৃথক দুই দিনে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে এই মর্মান্তিক ও আকস্মিক দুর্ঘটনাগুলো ঘটে, যার ফলে প্রবাসী তিন বাংলাদেশির জীবনাবসান হয়।
নিহত তিন বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তাঁরা হলেন—লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর হামছাদী এলাকার বাসিন্দা হারুন ও রাসেল এবং ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বাসিন্দা ফারুক ইসলাম। জীবিকার তাগিদে এবং নিজেদের পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি আনার লক্ষ্যে এই প্রবাসীরা দীর্ঘ বছর ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করে আসছিলেন। তাঁদের এই আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছানোর পর নিহতের পরিবার ও স্থানীয় স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং নিহতদের পারিবারিক সূত্রের বরাতে লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা হারুন ও রাসেল দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে কর্মরত ছিলেন। রোববার রাতে রিয়াদের একটি স্থানীয় সড়ক দিয়ে এই দুই বন্ধু মোটরবাইক বা মোটরসাইকেলে করে যাতায়াত করছিলেন। পথিমধ্যে সড়কে একটি উটের সাথে তাঁদের বহনকারী মোটরসাইকেলটির তীব্র সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষের ফলে হারুন ও রাসেল দুজনেই মারাত্মক ও গুরুতরভাবে আহত হন।
দুর্ঘটনার পর পরই স্থানীয় পথচারী ও উদ্ধারকারীরা দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহত হারুনের পিতা তছলিম উদ্দীন ছৈয়াল তাঁর সন্তানের এই অকাল প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের নিকট জরুরি ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন।
এলাকাবাসী ও প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গেছে, নিহত হারুন ও রাসেল বাস্তব জীবনে একে অপরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁদের এই আকস্মিক ও সমসাময়িক মৃত্যুতে পুরো গ্রামজুড়ে স্থবিরতা ও শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষও নিহতদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এবং সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
নিহত এই দুই প্রবাসী কর্মজীবীর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা। তিনি এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে জানান যে, প্রবাসী দুই যুবকের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির এই ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি আরও আশ্বাস দেন যে, নিহতদের মরদেহ যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সরকারি বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মরদেহ দেশে আনা এবং আর্থিক অনুদান বা সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হলে, উপজেলা প্রশাসন তাঁদের সর্বোচ্চ ও সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর সংবাদদাতা নিহত ফারুক ইসলামের পরিবারের বরাতে জানান যে, সোমবার সকালে সৌদি আরবে নিজের কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একটি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন ফারুক ইসলাম। তিনি মোটরবাইক বা মোটরসাইকেলযোগে নিজের গন্তব্যে যাওয়ার সময় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত ফারুক ইসলাম ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ ব্যাপারীর সন্তান ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিন সন্তানের জনক ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে আরও জানা গেছে, ফারুক ইসলাম নিজের এবং পরিবারের জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সৌদি আরবে কঠোর পরিশ্রম করে আসছিলেন। প্রবাস জীবনে থাকার শেষ পর্যায়ে তিনি আজ থেকে আনুমানিক তিন বছর আগে সর্বশেষ ছুটিতে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রবাসে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ফারুক ইসলাম নিজ এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতেও অগ্রণী ও বিশেষ ভূমিকা পালন করতেন। তিনি প্রবাসে থাকাকালীন নিজের মেঝ ছেলে মাহফুজুর রহমান এবং নিজের আপন দুই ভাতিজাসহ এলাকার বেশ কয়েকজন যুবককে আইনি প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
ফারুক ইসলামের প্রতিবেশী চাচা আব্দুর রাজ্জাক তাঁর স্মৃতিচারণ করে বলেন যে, ফারুক ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত বিনয়ী, পরোপকারী এবং নম্র প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি যখনই প্রবাস থেকে ছুটিতে দেশে আসতেন, এলাকার সাধারণ ও দরিদ্র মানুষকে নানাভাবে আর্থিক ও সামাজিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তাঁর এই অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবার যেমন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে, তেমনি পুরো এলাকার সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। ফারুকের পরিবারও এখন রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় তাঁর মরদেহ দ্রুত দেশে এনে দাফন করার প্রক্রিয়ার দিকে চেয়ে রয়েছে।