খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করে ক্ষমা চাওয়ার পর বনফুল নামক একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী কর্মচারী, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার পরদিন এই প্রশাসনিক তৎপরতা ও জরিমানার ঘটনাটি ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘটনার বিবরণ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবের পূর্বে ওসমানীনগরের পার্শ্ববর্তী বালাগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজপুর বাজারে অবস্থিত প্রসিদ্ধ মিষ্টি বিপণন প্রতিষ্ঠান ‘বনফুল’-এর শোরুম থেকে মিষ্টি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে মিষ্টিগুলো বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর তিনি সেগুলো পুরোনো এবং বাসি বলে অভিযোগ তোলেন। বিষয়টি তিনি দাপ্তরিকভাবে ওসমানীনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশাকে অবহিত করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঈদের পরদিন শুক্রবার বিকেলে ওসমানীনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা কোনো দাপ্তরিক প্রটোকল বা পরিচয় না দিয়ে, একজন সাধারণ ক্রেতার ছদ্মবেশে তাজপুর বাজারের বনফুলের ওই শোরুমে যান। সেখানে কর্তব্যরত কর্মচারী মান্নানের কাছে তিনি মিষ্টির গুণগত মান ও উৎপাদন সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে কর্মচারী মান্নান তাকে অবহিত করেন যে, দোকানে থাকা ড্রাই বা শুকনা মিষ্টিগুলো ঈদের আগের তৈরি এবং সাধারণ মিষ্টিগুলো সেদিনের অর্থাৎ শুক্রবারের তৈরি।
এ সময় ছদ্মবেশী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগ করেন যে, এই শোরুম থেকে বাসি মিষ্টি বিক্রি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। কর্মচারী মান্নান বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা না বাড়িয়ে দোকানের ব্যবস্থাপকের (ম্যানেজার) সাথে কথা বলার জন্য অনুরোধ জানালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিজের দাপ্তরিক পরিচয় প্রদান করেন এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার পরিচয় পেয়ে সাধারণ কর্মচারী মান্নান ভয় পেয়ে যান এবং দোকান ছেড়ে চলে যান।
কর্মচারী চলে যাওয়ার পর বনফুলের তাজপুর শোরুমের ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি দোকান ছেড়ে চলে যাওয়া কর্মচারী মান্নানকে পুনরায় শোরুমে ডেকে আনেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মান্নান নিজের ভুল বুঝতে পেরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ক্ষমা চাইতে যান এবং সাধারণ ভাষায় বলেন, “আপা, ভুল হয়েছে, আমাকে মাফ করে দেন।” এই ‘আপা’ সম্বোধন করার পরপরই ভ্রাম্যমাণ আদালত বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অধীনে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে বনফুল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কর্মচারী মান্নানকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার বিশেষ হস্তক্ষেপে তার চাকরি পুনর্বহাল করা হলেও তাকে আর ওই শোরুমে রাখা হয়নি। শাস্তিস্বরূপ তাকে সিলেট মহানগরীর খাদিম বিসিক শিল্প এলাকায় অবস্থিত বনফুলের মূল কারখানায় বদলি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী কর্মচারী মান্নান নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে বনফুল প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত সততার সাথে চাকরি করছেন এবং তার পুরো চাকরি জীবনে কোনো খারাপ রেকর্ড নেই। তিনি কেবল একজন সাধারণ ক্রেতা ভেবে সঠিক তথ্য দিয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন তিনি একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ব্যবস্থাপকের পরামর্শে ক্ষমা চাইতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ‘আপা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। এরপরই তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, যা তার মতো একজন সাধারণ কর্মচারীর প্রতি গভীর অবিচার।
বনফুলের তাজপুর শোরুমের ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কর্মচারী মান্নান শুরুতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়কে চিনতে পারেননি এবং সাধারণ ক্রেতা মনে করায় যথাযথ প্রটোকল বা গুরুত্ব দিতে পারেননি। পরে তাকে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলা হলে সে সরল বিশ্বাসে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করে। এরপরই এই জরিমানার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
এই সুনির্দিষ্ট প্রসঙ্গে বালাগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান গণমাধ্যমের কাছে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক মতামত ব্যক্ত করে বলেন, প্রশাসনিক নিয়মনীতি অনুযায়ী শুধু ‘আপা’ ডাকার কারণে কোনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউকে আর্থিক জরিমানা করতে পারেন না। হয়তো সেখানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক অনিয়মের কারণে এই জরিমানা করা হয়েছে। বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে বিস্তারিত না জেনে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করা কঠিন।
এই ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য ও প্রকৃত কারণ জানতে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশার সাথে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানিয়েছেন যে, এই বিষয়টি সম্পর্কে তিনি পূর্বে অবগত ছিলেন না এবং খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত বলতে পারবেন। সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আশরাফুর রহমানও একই ধরণের অভিমত প্রকাশ করে জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও আইনগত প্রেক্ষাপট সম্পর্কে দাপ্তরিকভাবে জানার পরই কেবল এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব হবে।